সড়ক দুর্ঘটনা ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু রোধে করণীয় কী

প্রকাশ:

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটছে, যা বর্তমানে একটি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষ করে দুই ঈদের সময় কয়েক দিনের ব্যবধানেই ঝরে যায় শত শত প্রাণ। অথচ সচেতনতা এবং দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু রোধ করা সম্ভব।

সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে নিয়ন্ত্রণহীন গতি এবং অধিক মুনাফার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। পরিবহন মালিকরা বাড়তি আয়ের আশায় চালকদের দিয়ে মাত্রাতিরিক্ত সময় গাড়ি চালাচ্ছেন, যার ফলে ক্লান্ত চালকের আসনে অনেক সময় হেল্পারদের বসতে দেখা যায়। এই অব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন চালকের দৌরাত্ম্য। অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষ চালক অপরিচিত রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ছেন, কারণ নির্দিষ্ট সময় পর গাড়ি পরীক্ষা করার বা নির্দিষ্ট গাড়ির জন্য নির্দিষ্ট চালক নিয়োগের সংস্কৃতি আমাদের দেশে গড়ে ওঠেনি। এছাড়া সিটি সার্ভিসের বাসগুলো দূরপাল্লার রাস্তায় নামানোর প্রবণতাও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

যাত্রীদের দায়িত্বহীনতাও সড়ক দুর্ঘটনার জন্য দায়ী। নির্দিষ্ট স্টপেজ ছাড়া চলন্ত গাড়ি থেকে ওঠা-নামা করা, ব্যস্ত রাস্তায় চলাচলের সময় মোবাইল ফোনে কথা বলা এবং ফুটপাত দখল ও অবৈধ হাটবাজারের কারণে নিয়মিত প্রাণ ঝরছে। চালকদের জীবনের করুণ চিত্রও এখানে বড় ভূমিকা রাখে; ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাদের জীবন কাটে রাস্তায়, নেই কোনো সামাজিক মূল্যায়ন বা বিনোদন। এই মানসিক ক্লান্তি থেকে কিছু চালক মাদকের জালে জড়িয়ে পড়ছেন।

সড়কে প্রাণরক্ষা করতে হলে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়, বরং মালিক, চালক ও যাত্রীদের মানসিকতায় পরিবর্তন প্রয়োজন। উন্নত বিশ্বের মতো বায়োমেট্রিক প্রযুক্তির মাধ্যমে চালকের কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, যেখানে একজন চালক দিনে সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা গাড়ি চালানোর সুযোগ পাবেন। এছাড়া চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ, সম্মানজনক কর্মপরিবেশ, আলাদা পোশাক এবং কর্মজীবন শেষে মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করা উচিত।

যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে যাতে তারা নির্দিষ্ট স্টপেজ থেকে গাড়ি ব্যবহার করেন এবং চালকের প্রতি সৌজন্যবোধ প্রদর্শন করেন। মোবাইল ফোন ব্যবহার করে গাড়ি চালানো বা রাস্তা পার হওয়া বন্ধ করতে লাইসেন্স ও রুট পারমিট বাতিলের মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। মালিক, চালক ও যাত্রী সবাই নৈতিকতা ও দায়িত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হলেই নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং উৎসবের আনন্দ শোকে পরিণত হবে না।

শেয়ার করুন