তৈল মর্দন ও চাটুকারিতার সামাজিক রসায়ন: একটি বিশ্লেষণ

প্রকাশ:

হর প্রসাদ শাস্ত্রীর তৈল বিষয়ক রচনার অনুপ্রেরণায় তৈল মর্দন বা চাটুকারিতার বিষয়টি বর্তমান সমাজে এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সংস্কৃত কবিদের মতে তৈল ও স্নেহ একই পদার্থ, যা রূপক অর্থে চাটুকারিতার সাথে তুলনীয়। শাস্ত্রী মশাইয়ের মতে, যে ব্যক্তি তেল দিতে সক্ষম, বিদ্যা না থাকলেও তিনি প্রফেসার হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেন। তৈল মর্দনের গুণ যার আছে, তার জন্য সুযোগের দুয়ার সবসময় খোলা থাকে। এক্ষেত্রে প্রচলিত কিছু উক্তি হলো—যত বেশি তেল দেওয়া যায়, চাকরি তত মসৃণ হয়; নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারলে অন্যের জুতো পালিশ করা ছাড়া উপায় নেই; তৈলবাজদের মগজ কম থাকলেও সুযোগের অভাব হয় না; আর তেল মেরে সম্মান পাওয়া গেলেও যোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব নয়।

তৈল প্রদানকারী এবং গ্রহণকারীর মধ্যে একটি অদ্ভুত সমীকরণ কাজ করে। যারা তেল নেয় তারা বদলালেও, যারা তেল দেয় তারা সাধারণত গিরগিটির মতো চরিত্র নিয়ে একই জায়গায় থেকে যায়। এরা ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেদের রূপ পাল্টে নতুন ক্ষমতাশালীদের দলে ভিড়ে যায়। ছোটবেলার পাঠ্যবইয়ের সেই বিখ্যাত অংকটির কথা আজও মনে পড়ে, যেখানে একটি বানর তৈলাক্ত বাঁশ বেয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করত। বাঁশটির উচ্চতা ১০০০ ফুট হলে এবং বানরটি প্রতি মিনিটে ৫ ফুট উপরে উঠে ৪ ফুট নিচে নেমে গেলে, তার চূড়ায় পৌঁছাতে কত সময় লাগবে—এই অংকটি করার সময় এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করত। মনে হতো, বানরটি স্বইচ্ছায় এই কাজ করছে না, বরং তার পেছনে কেউ আঘাত করছে বলেই সে বাধ্য হয়ে তৈলাক্ত বাঁশে ওঠার কসরত করছে।

বাঙালির জীবনে তৈল মর্দনের এই চর্চা ছোটবেলা থেকেই শুরু হয়। তৈল গ্রহণকারী ব্যক্তি অনেক সময় বোঝেন যে তিনি এই তেল পাওয়ার যোগ্য নন, কিন্তু প্রাপ্তির আশায় তিনি সেই চাটুকারিতাকে প্রশ্রয় দেন এবং উপভোগ করেন। তিনি নিজেকে খুব চতুর মনে করলেও, শেষ পর্যন্ত তেল দেওয়া এক্সপার্টরা তৈলাক্ত ব্যক্তিদেরই ব্যবহার করে তাদের সর্বনাশ ডেকে আনে। এই প্রক্রিয়ার পরিণতি অনেকটা স্যাচুরেটেড চর্বি বা ট্রান্স ফ্যাটের মতো। প্রথমে এটি মসৃণ মনে হলেও, শেষ পর্যায়ে এটি শরীরের বা পরিস্থিতির জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যখন একজন ব্যক্তি এই জটিল সমীকরণ বুঝতে পারেন, তখন অনেক দেরি হয়ে যায় এবং পাশে আর কোনো মোসাহেব খুঁজে পাওয়া যায় না।

শেয়ার করুন