বিশ্বজুড়ে হালাল পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়লেও বাংলাদেশে সমন্বিত নীতিমালার অভাব, সার্টিফিকেশন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং কাঁচামালের উৎস শনাক্তে সমস্যার কারণে এই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি কাটাতে একটি পৃথক হালাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা, টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি এবং নির্ভরযোগ্য সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ী ও খাত বিশেষজ্ঞরা। নির্দিষ্ট পণ্যের জন্য কীভাবে সার্টিফিকেশন দিতে হবে, তা প্রটোকলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। এরপর চূড়ান্ত অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘ইনভেস্টস মিটআপ ৩.০’ অনুষ্ঠানে ‘হালাল শিল্পে বিনিয়োগ’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় বক্তারা এসব মতামত তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু খাদ্যদ্রব্য নয়; তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, প্রসাধনী, ওষুধ ও কৃষিশিল্পেও হালাল মানের কদর বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশে উপযুক্ত পরিকাঠামো না থাকায় ব্যবসায়ীরা বিড়ম্বনার মুখে পড়ছেন।
আলোচনায় বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার পারভেজ বলেন, ইসলামিক ফাউন্ডেশন কিংবা বিএসটিআই—কোনো প্রতিষ্ঠানই এখন পর্যন্ত ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশিত আস্থা অর্জনে পুরোপুরি সফল হতে পারেনি। ব্যবসায়ীদের অসচেতনতা ও সমন্বয়ের ঘাটতিও রয়েছে। সব খাতকে একই ছাতার নিচে এনে একটি হালাল ইনস্টিটিউট বা পৃথক হালাল বিভাগ গড়ে তোলা গেলে ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। এটি করা গেলে নীতিগত অস্পষ্টতা দূর হবে এবং রপ্তানিকারকদের হয়রানি কমবে। তবে এ জন্য প্রয়োজন নীতিগত সিদ্ধান্ত ও সবার সম্মিলিত অঙ্গীকার।
আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের উৎস এবং উৎপাদনে স্বচ্ছতা বা ট্রেসিবিলিটির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বিসিআই সভাপতি জানান, ক্রেতারা এখন জানতে চান তুলা বা সুতার উৎস কী এবং তা সার্টিফায়েড কি না। পোশাকশিল্পের পাশাপাশি কৃষিপণ্যে ব্যবহৃত সার বা রাসায়নিক পরিবেশবান্ধব কি না, সেটিও ইউরোপসহ বৈশ্বিক বাজারে দেখা হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এসব শর্ত পূরণ করা না গেলে তৈরি পোশাক ও হালাল পণ্য রপ্তানি কঠিন হয়ে পড়বে। একটি সুতা কোথা থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে, তুলার উৎপত্তি কী, সেটির সার্টিফিকেশন আছে কি না, এসব তথ্যও ক্রেতারা জানতে চান। তিনি বলেন, কাঁচামালের উৎস থেকে শুরু করে উৎপাদনের প্রতিটি ধাপের তথ্য সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। এসব টিমের সদস্যরা কারখানা পরিদর্শন করেন এবং উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষণ করেন।
আলোচনায় চামড়াজাত পণ্য ও অন্যান্য খাতের ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, পশুর উৎস ও সরবরাহের ধারাবাহিক তথ্য বা ট্রেসিবিলিটি সংগ্রাহ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে হালাল সনদ নিতে হবে, সে বিষয়েও ব্যবসায়ীদের মাঝে বিভ্রান্তি রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের প্রশ্নের জবাবে বিএসটিআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক এস এম ফেরদৌস আলম জানান, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বা বিএসটিআই যেখান থেকেই সনদ দেওয়া হোক, নির্দিষ্ট প্রটোকল মেনে চলা বাধ্যতামূলক। শরিয়াহভিত্তিক বিষয় পর্যবেক্ষণে বিএসটিআইয়ের ৫-৬টি বিশেষ টিম রয়েছে, যারা কারখানার সব ধাপ তদারকি করে। প্রাথমিক ত্রুটি থাকলে তা শোধরানোর সুযোগ দেওয়া হয় এবং পরে অনুমোদন মেলে।
তিনি আরও জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায় বিএসটিআইকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী বিএসটিআইয়ে কোটি কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ হালাল ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে, যা ইতোমধ্যে অ্যাক্রেডিটেশন লাভ করেছে। তাই সনদ নেওয়া নিয়ে দ্বিধা করার কারণ নেই। পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটি এককভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যায় পড়লে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনায় বিএসটিআইকেও এ কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়।
অপরদিকে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের হালাল সার্টিফিকেশন বিভাগের পরিচালক ড. এ কে এম বদরুল আহসান জানান, ২০২৩ সালে হালাল সার্টিফিকেট নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সরকারি ‘অ্যালোকেশন অব বিজনেস’-এ ইসলামিক ফাউন্ডেশনকে হালাল সার্টিফিকেশন ও হালাল স্ট্যান্ডার্ড সার্টিফিকেশনের মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে ‘হালাল শিল্পে বিনিয়োগের সম্ভাবনা’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মো. মমিনুল ইসলাম। প্রবন্ধে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক হালাল অর্থনীতির আকার ছিল প্রায় ৭.৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৪ থেকে ২০৩৪ সাল পর্যন্ত ৬.২ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার (সিএজিআর) বজায় থাকলে ২০৩৪ সালের মধ্যে এই বাজার ১২.৬ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৪ শতাংশ বা ১.৯ বিলিয়ন মুসলিম ভোক্তা রয়েছে, যা বৈশ্বিক সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রায় ১১.৪ শতাংশ অবদান রাখে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৮০২টি হালাল সার্টিফায়েড পণ্য ও ৩০১টি সার্টিফায়েড উৎপাদক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ৯১ শতাংশ মুসলিম জনগোষ্ঠীর সুবাদে অভ্যন্তরীণ বাজারেও এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯৪৩ মিলিয়ন ডলারের হালাল পণ্য রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।





