২২ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অস্ত্র রপ্তানি কি সুইজারল্যান্ডের নিরপেক্ষতার আদর্শকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে?

প্রকাশ:

বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্রে সুইজারল্যান্ড একটি ব্যতিক্রমী নাম। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দেশটি নিরপেক্ষতার এক অনন্য প্রতীকে পরিণত হয়েছে। দুই বিশ্বযুদ্ধ, স্নায়ুযুদ্ধ কিংবা সাম্প্রতিক ইউরোপীয় নিরাপত্তা সংকট—প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেশটি শান্তি রক্ষা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার কাজ করেছে। তবে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশটি এমন এক জটিল প্রশ্নের মুখোমুখি, যার উত্তর কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং নৈতিকতা ও রাষ্ট্রদর্শনের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। প্রশ্নটি হলো, একটি নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে সুইজারল্যান্ড কতটা অস্ত্র রপ্তানি করতে পারে?

ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপের সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও দৃশ্যপট আমূল বদলে গেছে। পশ্চিমা দেশগুলো তাদের প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা জোরদারে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় সুইজারল্যান্ডের প্রচলিত অস্ত্র রপ্তানি নীতি ইউরোপের অনেক দেশের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুইস আইন অনুযায়ী, যুদ্ধরত কোনো দেশের কাছে সরাসরি অস্ত্র বিক্রি করা নিষিদ্ধ। এমনকি সুইস অস্ত্র কেনা অন্য কোনো দেশও সুইজারল্যান্ডের পূর্বানুমতি ছাড়া তা তৃতীয় কোনো দেশের কাছে পুনরায় রপ্তানি করতে পারে না। ফলে জার্মানি, ডেনমার্ক কিংবা নেদারল্যান্ডসের মতো দেশগুলো ইউক্রেনকে সহায়তা করতে গিয়ে সুইস গোলাবারুদ সরবরাহের ক্ষেত্রে আইনি বাধার মুখে পড়েছে।

এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে এক গভীর নীতিগত দ্বন্দ্ব। সুইজারল্যান্ডের সরকারি অবস্থানের মতে, নিরপেক্ষতা বজায় রাখার জন্য এ ধরনের বিধিনিষেধ অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু ইউরোপের একটি বড় অংশ মনে করে, আগ্রাসনের শিকার কোনো দেশকে আত্মরক্ষার সুযোগ করে দেওয়া নিরপেক্ষতার লঙ্ঘন নয়, বরং এটি একটি মানবিক দায়িত্ব। নিরপেক্ষতার এই নতুন সংজ্ঞা ও প্রয়োগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক। এদিকে, বর্তমান আইনি জটিলতা নিরসনে সুইস সরকার অস্ত্র রপ্তানি নীতি শিথিল করার পরিকল্পনা করছে। তাদের আশঙ্কা, এই কড়াকড়ির ফলে দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। রাজনৈতিক ও আইনি অনিশ্চয়তার কারণে অনেক দেশ সুইস অস্ত্র কেনায় অনীহা প্রকাশ করছে, যা ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ন্যাটো কেন্দ্রিক বড় কোনো সংঘাতে সরবরাহ সংকট সৃষ্টির আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সরকার ও সংশ্লিষ্ট শিল্পের প্রতিনিধিদের দাবি, প্রতিরক্ষা শিল্প শুধু ব্যবসার মাধ্যম নয়, বরং এটি জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। অস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা স্থবির হয়ে গেলে দক্ষ জনবল, অত্যাধুনিক প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও শিল্পভিত্তি হারানোর ঝুঁকি থাকে। তবে এর বিপরীত মেরুতে থাকা বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছেন, অস্ত্র কি কোনো সাধারণ পণ্য? তাদের মতে, ওষুধ বা অন্যান্য ভোগ্যপণ্যের সাথে অস্ত্রের তুলনা চলে না, কারণ এর চূড়ান্ত ব্যবহার যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণহানির ঘটনা ঘটায়। অর্থনৈতিক মুনাফার লোভে এমন একটি শিল্পকে উৎসাহিত করা নৈতিকভাবে কতটুকু যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছেন।

তবে মজার বিষয় হলো, সুইস অর্থনীতিতে অস্ত্র শিল্পের অবদান সংখ্যাতাত্ত্বিকভাবে খুব একটা বড় নয়। সরকারি তথ্য অনুসারে, দেশটির মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ০.৪ শতাংশ এবং জিডিপির প্রায় ০.৪ শতাংশ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া মোট রপ্তানির মাত্র ০.২ শতাংশ আসে যুদ্ধসরঞ্জাম থেকে। সুইজারল্যান্ডের প্রকৃত অর্থনৈতিক শক্তি আসে মূলত ব্যাংকিং, প্রযুক্তি, ওষুধশিল্প ও উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্য থেকে। তবুও গবেষণার প্রসার ও কৌশলগত সক্ষমতা ধরে রাখতে প্রতিরক্ষা শিল্পকে তারা পুরোপুরি উপেক্ষা করতে পারছে না।

সুইজারল্যান্ডের সামনে এখন আসল সংকট আত্মপরিচয় রক্ষার। দেশটি বিশ্বজুড়ে পরিচিত হয়েছে নিরপেক্ষ ও নির্ভরযোগ্য রাষ্ট্র হিসেবে, যার ওপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে রেডক্রসের কার্যক্রম, শান্তি আলোচনা ও মানবিক কূটনীতির সাফল্য। এই বিশ্বাসযোগ্যতাই ছোট দেশ হিসেবে সুইজারল্যান্ডের মূল শক্তি। লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সহিদুল আলম স্বপনের মতে, অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য দীর্ঘদিনের অর্জিত কূটনৈতিক পুঁজি হারানো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটি শুধু অস্ত্র রপ্তানির নিয়ম বদলানোর নয়, বরং একবিংশ শতাব্দীতে নিরপেক্ষতাকে একটি জীবন্ত আদর্শ হিসেবে টিকিয়ে রাখা হবে কি না, তা নির্ধারণের। কারণ একবার সেই বিশ্বাস ক্ষয়ে গেলে, সুইস ব্যাংক বা ঘড়ির মতো খ্যাতিও তখন আর রাষ্ট্রটিকে আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

শেয়ার করুন