পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে একটানা বিক্ষোভ, কর্মবিরতি ও সংঘর্ষের ঘটনায় দেশের প্রধান রপ্তানি খাত বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। প্রায় এক সপ্তাহের এই অস্থিরতায় শত শত কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম থমকে যাওয়ায় রপ্তানি বাণিজ্যে ব্যাপক বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন কারখানা ও স্থাপনায় ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মালিক পক্ষ ও বিভিন্ন সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, এই আন্দোলনে পোশাক খাতের সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে আরও সপ্তাহখানেক সময় প্রয়োজন হতে পারে। অর্থনীতিবিদরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এই দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা নতুন ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকি তৈরি করবে এবং রপ্তানি বাজারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তবে গাজীপুরের এই হিসাব এবং আগের দুইদিনের রপ্তানি বিঘ্নের হিসাবের মধ্যে সময়ের আংশিক পুনরাবৃত্তি থাকতে পারে। গাজীপুরের কোনাবাড়ী, কালিয়াকৈরসহ বিভিন্ন এলাকায় কারখানা ও গুদামে আগুন এবং মিরপুরে পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বছরের মোট রপ্তানি আদেশের একটি বড় অংশের ক্রয়াদেশ এ সময়েই আসে।
তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র তথ্যমতে, গত ১ নভেম্বর মিরপুর, গাজীপুর, সাভার ও আশুলিয়াসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল, যার ফলে প্রায় ৩ কোটি ডলার বা ৩৭৩ কোটি টাকার রপ্তানি কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া ৩রা নভেম্বর ১৫০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধের তথ্য পাওয়া যায়।
পরের দিন ২ নভেম্বর ঢাকা ও আশপাশের ৬৯০টি কারখানায় কাজ বন্ধ থাকায় আরও ৪ কোটি ডলারের রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়। এ সময় প্রায় ১৬ লাখ ৮০ হাজার শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি। সব মিলিয়ে প্রথম দুইদিনেই প্রায় ৭ কোটি ডলার বা ৮৫০ কোটি টাকার রপ্তানি কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরবর্তী তিন দিনে (৩ থেকে ৫ নভেম্বর) আরও ৪২০টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ থাকায় অতিরিক্ত ৩ কোটি ডলার বা ৩৭৩ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে। সব মিলিয়ে আলোচ্য সময়ে রপ্তানিকারকদের প্রায় ১ হাজার ২২৩ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে। বিজিএমইএ জানিয়েছে, শুধুমাত্র গাজীপুরেই ছয়দিনের আন্দোলনে প্রায় ৮৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে এবং সব মিলিয়ে আন্দোলনের এই কয়দিনে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে।
আন্দোলন চলাকালে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির দিকে যাওয়ায় মিরপুর-১০, মিরপুর-১১ ও পল্লবী মেট্রোরেল স্টেশনে সাময়িকভাবে ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে দফায় দফায় কারখানা ছুটি ঘোষণা করা হয়। কারখানার মালিকরা জানিয়েছেন, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও বিদ্যুৎ, গ্যাস, প্রশাসনিক ব্যয় এবং যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের মতো নির্দিষ্ট খরচগুলো তাদের নিয়মিত বহন করতে হয়। স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম জানান, তার প্রতিষ্ঠানের ৪৫টি উৎপাদন লাইনবিশিষ্ট দু’টি কারখানা বন্ধ রাখায় প্রতিদিন ৯০ হাজার ডলার ব্যয় হচ্ছে। তিনি আরও জানান, উৎপাদন সূচি ব্যাহত হওয়ায় বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ হারানোর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। পণ্য পাঠাতে দেরি হলে জরিমানা, আকাশপথে অতিরিক্ত ব্যয়ে পণ্য পরিবহন কিংবা ভবিষ্যতে ক্রয়াদেশ অন্য দেশে চলে যাওয়ার মতো গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়টি পোশাকের ক্রয়াদেশ ও সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজিএমইএ’র সহ-সভাপতি (অর্থ) মো. মিজানুর রহমান জানান, শ্রমিকরা কারখানায় এসেও কাজে যোগ না দিয়ে আন্দোলনে সক্রিয় হওয়ায় উৎপাদন চালানো সম্ভব হয়নি। যদিও বেশ কিছু কারখানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, তবে সরাসরি সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনও সুনির্দিষ্ট নয়। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, শ্রমিক বিক্ষোভের ফলে পোশাক শিল্পে যা ঘটছে তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি সতর্ক করে বলেন, রপ্তানির শীর্ষ এ খাতে বিশৃঙ্খলা দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে। বিজিএমইএ’র হিসাবে প্রায় ২০-২৫টি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।





