২১ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কক্সবাজারে অভিযানে প্রাণ হারালেন সেনাবাহিনীর সদস্য তিতাস শেখ

প্রকাশ:

কক্সবাজারের টেকনাফে মানব পাচারকারীদের সঙ্গে যৌথ বাহিনীর গোলাগুলিতে সেনাবাহিনীর সদস্য তিতাস শেখ (২৭) নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রঙ্গীখালী এলাকার গহিন পাহাড়ে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অভিযানে বাঁ কাঁধে গুলিবিদ্ধ হলে দ্রুত তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের বাসিন্দা তিতাস শেখ সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

২০১৭ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দেন। তিতাস দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার বড়। তাঁর বাবা আফজাল শেখ একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য এবং ছোট ভাই আকাশ হোসেনও বর্তমানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন। চার বছর আগে পার্শ্ববর্তী গ্রামের সুমাইয়া আক্তারকে (২২) বিয়ে করেছিলেন তিনি। আগামী ডিসেম্বরে স্ত্রীকে নিজের কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল তিতাসের, কিন্তু তার আগেই সন্ত্রাসীদের বুলেট তাঁর জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিল। পরিবার সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগদান করেন তিতাস শেখ।

শুক্রবার বিকেলে সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার মরদেহটি নিয়ে ফরিদপুরের নগরকান্দা মাহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমি মাঠে পৌঁছায়। পদ্মা সেনানিবাস ক্যাম্পের ১৫ আরই রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মেজর সোহেল আহমেদের নেতৃত্বে একটি দল মরদেহ গ্রহণ করে। এরপর লস্করদিয়া আতিকুর রহমান উচ্চবিদ্যালয় মাঠে বাদ মাগরিব জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় পরিবারের পক্ষ থেকে নিহতের মামা ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবুল তালুকদারসহ স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। পরে লস্করদিয়ার স্থানীয় কবরস্থানে নানির কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

দাফন শেষে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয় এবং সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এ সময় সাতজন সৈনিক তিন দফায় ২১টি গুলি ছুড়ে তাঁদের সহকর্মীকে শেষ বিদায় জানান। নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন জানান, সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিকতা শেষে মরদেহ এলাকায় আনা হয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে জানাজা সম্পন্ন হয়।

ছেলের মৃত্যুর খবরে লস্করদিয়া গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। মা রেখা বেগম জানান, গত বুধবার রাতে শেষবারের মতো ছেলের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। সে জানিয়েছিল, বৃহস্পতিবার বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাচ্ছে। তিতাসের স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার স্বামীর অকাল প্রয়াণে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলতে থাকেন, ‘আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকব! আমার আর কোনো অস্তিত্ব রইল না।’ ছেলের শোকে বাবা আফজাল শেখ বাক্‌রুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। শোকসন্তপ্ত স্বজন ও প্রতিবেশীদের কান্নায় পুরো এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে। কক্সবাজারে সন্ত্রাসী অভিযানে স্বামীর নিহত হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই বিলাপ করে চলেছেন তাঁর স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। ছেলেকে হারিয়ে বাবা আফজাল শেখের মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না। বাক্‌রুদ্ধ হয়ে শুধুই ঝরছে চোখের পানি।

শেয়ার করুন