যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শাসনামলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সম্পর্কের জটিলতা ও রূপান্তর বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে। নিউইয়র্কে প্রবাসী ভারতীয় ও নীতিনির্ধারকদের এক অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর মন্তব্য করেছিলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক দেশেরই সম্পর্ক আগের চেয়ে কঠিন হয়ে পড়েছে। তবে এই পরিস্থিতির ব্যতিক্রম হিসেবে উঠে আসছে পাকিস্তানের নাম।
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলো যখন নিরাপত্তার অনিশ্চয়তা ও বিকল্প অংশীদার খোঁজার চেষ্টায় ব্যস্ত, তখন পাকিস্তান ও ট্রাম্পের প্রশাসন এক নতুন মৈত্রীতে আবদ্ধ হয়েছে। যদিও পাকিস্তানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দমনপীড়ন ও সামরিক শাসন কায়েমের অভিযোগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে সমালোচনার ঝড় বইছে। আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিতব্য মার্কিন নির্বাচনে ডনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জন্য প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের মতে, ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এই নির্বাচনের ফল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহ্যগত মার্কিন মিত্রদের সঙ্গে কয়েক দশকের আস্থার সম্পর্কেও ফাটল ধরেছে। দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মার্কিন মিত্রদেশগুলোর নেতারাও ট্রাম্পের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন, অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগতভাবেও। কিন্তু এই অস্থিরতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একসময় গভীর সংকটে থাকা সম্পর্ককে অংশীদারত্বে রূপ দিতে পেরেছে পাকিস্তান। কংগ্রেসের নির্বাচনে ট্রাম্পের পরীক্ষা মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
কূটনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের সম্পর্কে টানাপড়েন ছিল। আফগানিস্তানে তালেবানের প্রতি সমর্থনের অভিযোগ নিয়ে বাইডেন ও ট্রাম্প উভয়ই পাকিস্তানের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু সম্পর্কের মোড় ঘুরে যায় ২০২৫ সালের মার্চ মাসে। কাবুল বিমানবন্দরের অ্যাবে গেট হামলায় জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারে সহায়তা করায় ট্রাম্প নিজে কংগ্রেসের ভাষণে পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানান। পরবর্তীতে ১০ মে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত যুদ্ধের সময় যুদ্ধবিরতি ঘোষণা এবং এতে ট্রাম্পের মধ্যস্থতা বিষয়টি কূটনৈতিক মহলে বড় আলোচনার জন্ম দেয়। যদিও ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্পের দাবি অস্বীকার করে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার কথা বলেছে। অথচ পাকিস্তানের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন এবং কার্যত সামরিক শাসন পাকাপোক্ত করার অভিযোগে দেশটির সরকারের সমালোচনা বাড়ছে। তবে দ্বিতীয় মেয়াদের মাত্র দুই মাসের মাথায়, ২০২৫ সালের মার্চে, কাবুল বিমানবন্দরের অ্যাবে গেট এলাকায় ২০২১ সালের বোমা হামলার এক সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারে সহায়তা করায় কংগ্রেসে দেয়া ভাষণে পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানান ট্রাম্প। ভারতশাসিত কাশ্মীরে সশস্ত্র হামলায় ২৬ জন পর্যটক নিহত হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তান চার দিনের তীব্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অস্থির সময়ে শুল্ক আরোপ ও ইরান যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে। ১০ মে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সংঘাতের অবসান হয়। ট্রাম্প বারবার এই সম্পর্কের প্রশংসা করছেন। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্প ও তার দলের সাফল্য কামনা করবে এমন দেশগুলোর একটি পাকিস্তান। মধ্যস্থতার জন্য পাকিস্তান তাকে ধন্যবাদ জানায়।
ইসলামাবাদের সানোবার ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক কামার চিমার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতে পাকিস্তান এখন একটি অপরিহার্য পক্ষ। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দুই দেশের বাণিজ্য চুক্তির ফলে পাকিস্তানি পণ্যের ওপর মার্কিন শুল্ক ২৯ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নেমে আসে। এছাড়া খনিজসম্পদ, ড্রোন প্রযুক্তি ও ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইমরান খান মনে করেন, যদিও পাকিস্তান বড় কোনো সরাসরি সুবিধা পায়নি, তবে ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তাদের বৈশ্বিক কূটনৈতিক পরিচিতি ও গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, এমনকি পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল মিত্ররা এখন বিকল্প অংশীদারত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। তবে তিনি বলেন, ‘একই সঙ্গে বলা যায়, কিছু অমূর্ত সুবিধা-যেমন কূটনৈতিক পরিচিতি ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব-ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে পাকিস্তান সরাসরি তেমন কিছু অর্জন করেনি।’।
এদিকে নির্বাচনী জরিপগুলো ট্রাম্পের জনপ্রিয়তায় ভাটার টান দেখাচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত চালানো জরিপে তার প্রতি সমর্থন মাত্র ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত জানুয়ারিতে ছিল ৩৭ শতাংশ। ইমরান খানের আশঙ্কা, ডেমোক্র্যাটরা যদি আইনসভার উভয় কক্ষে জয়ী হয়, তবে তারা ট্রাম্পের নীতি থেকে সরে এসে পাকিস্তানের পরিবর্তে ভারতের সঙ্গে মৈত্রী গভীর করার দিকে বেশি মনোযোগ দিতে পারে।
প্যারিসের বুসোল মন্ডিয়ালের নির্বাহী পরিচালক গ্রেস ওয়ার্মেনবল মনে করেন, এই নির্বাচন স্বল্পমেয়াদে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি ও দীর্ঘমেয়াদে ২০২৮ বা ২০২৯ সালের হোয়াইট হাউসের ক্ষমতার পরিবর্তন নির্দেশ করতে পারে। পাকিস্তানের জন্য এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো, ট্রাম্পের প্রভাব কমলেও নিজেদের গুরুত্ব বজায় রাখা। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ট্রাম্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা পাকিস্তানের জন্য ভবিষ্যতে বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। দীর্ঘ মেয়াদে এই নির্বাচনের ফল ২০২৮ বা ২০২৯ সালে হোয়াইট হাউসে সম্ভাব্য ক্ষমতার পরিবর্তনেরও পূর্বাভাস দিতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, ‘প্রশ্নটি শুধু ট্রাম্পের প্রভাব কমে যাওয়ার নয়। তবে এটি পাকিস্তানের বর্তমান গুরুত্বের অবসানের সূচনা হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।





