বার্সেলোনার উত্তরে অবস্থিত মোলেত দেল ভালেসের রাস্তায় যে মেয়েটি ফুটবল খেলে বেড়ে উঠেছিল, সেই মেয়েটিই আজ বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চে টানা সাফল্যের এক দৃষ্টান্ত। বার্সেলোনা ছেড়ে সম্প্রতি লন্ডনে পাড়ি জমানো স্প্যানিশ মিডফিল্ডার আলেক্সিয়া পুতেয়াস জিতে নিয়েছেন তাঁর ক্যারিয়ারের তৃতীয় ব্যালন ডি’অর। ফুটবল দুনিয়ায় ‘লা রেইনা’ বা ‘রানি’ হিসেবে পরিচিত ৩২ বছর বয়সী এই তারকা নিজের এই অর্জনের মাধ্যমে ছুঁয়ে ফেলেছেন স্বদেশি সতীর্থ আইতানা বোনমাতির সর্বোচ্চ ব্যালন ডি’অর জয়ের রেকর্ড। বাড়িতে টেলিভিশনে ফুটবল চলত প্রায় সারাক্ষণ। টানা ছয় বছর পুরস্কারটি গেল স্প্যানিশ ফুটবলারের হাতে। ব্যালন ডি’অর জয়ের পর কি তাহলে ‘স্যার’ হ্যারি কেইন। পুতেয়াসের জন্ম বার্সেলোনা থেকে প্রায় ১২ মাইল উত্তর-পূর্বে মোলেত দেল ভালেসে। ৩২ বছর বয়সেও তাঁর পায়ে ফুটবলের জাদু যে ফুরিয়ে যায়নি, সেটি বোঝানোর জন্য এই সংখ্যাই যথেষ্ট।
পুতেয়াসের এই জয় কেবল আরেকটি ট্রফি জয়ের গল্প নয়, বরং চরম অনিশ্চয়তা ও দুঃসময় কাটিয়ে ফের চূড়ায় ওঠার মহাকাব্য। ২০২২ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ঠিক আগে হাঁটুর অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্টে (এসিএল) মারাত্মক চোট পান তিনি। এই চোট তাঁর ক্যারিয়ারকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছিল। সেই বছর তিনি দ্বিতীয়বারের মতো ব্যালন ডি’অর পেলেও দীর্ঘ সময় খেলার বাইরে থাকতে হয়। ২০২৩ সালে স্পেন নারী ফুটবল দল বিশ্বকাপ জয় করলেও সেখানে পুতেয়াসের উপস্থিতি ছিল মূলত পার্শ্বচরিত্রের মতো। পুতেয়াসের জীবনেও এসেছিল তেমন এক সময়। যে ফুটবলার একসময় ছিলেন দলের প্রাণ, তাঁকেই কি না বিশ্বজয়ের উৎসবে থাকতে হলো অনেকটা পার্শ্বচরিত্র হয়ে।
তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার সেই শঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে পুতেয়াস মাঠে ফেরেন নিজের চেনা রূপে। ২০২৪ সালের চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে গোল করার পর ২০২৫-২৬ মৌসুমে পুরোনো আগুনে পারফর্ম করতে থাকেন তিনি। বার্সেলোনাকে অধিনায়ক হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লিগসহ চারটি ট্রফি জেতান। বোনমাতি চোটের কারণে পাঁচ মাস মাঠের বাইরে থাকায় দলের মধ্যমাঠ ও আক্রমণের মূল দায়িত্ব তিনি কাঁধে তুলে নেন। গত মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে তিনি ২১টি গোল করেন এবং সতীর্থদের দিয়ে করান ১৩টি গোল। গত মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২১ গোল করেছেন। চ্যাম্পিয়নস লিগেই করেছেন ৭ গোল। হয়তো নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন, আগের সেই ফুটবল কি আর কখনো খেলতে পারবেন।
পরিসংখ্যান বলছে, ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের ফুটবলারদের মধ্যে পুতেয়াস গোলের সংখ্যায় তৃতীয় এবং সহায়তায় (অ্যাসিস্ট) দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন। চ্যাম্পিয়নস লিগে একাই করেন ৭টি গোল, যেখানে তাঁর চেয়ে বেশি গোল ছিল শুধু এভা পায়োর (১১), আলেসিয়া রুসো (৯) ও পারনিলে হার্ডারের (৮)। উল্লেখ্য, তাঁরা তিনজনই মূলত স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেন। এছাড়া চ্যাম্পিয়নস লিগে তিনি রেকর্ড ৩৬টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছিলেন, যা বায়ার্ন মিউনিখের ক্লারা বুল ছাড়া আর কেউ করতে পারেননি। এর আগে ২০২১-২২ আসরে ক্যারোলিন গ্রাহাম হ্যানসেনের ৩৮টির পর এটাই এক আসরে সর্বোচ্চ সুযোগ তৈরির রেকর্ড। সুযোগ পেলেই ছুটে যেত ক্যাম্প ন্যুতে। পুতেয়াসের ফুটবলকে শুধু গোল দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে।
স্প্যানিশ লিগে বার্সেলোনা টানা সপ্তম শিরোপা জয়ের পথে পুতেয়াসের অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
ওপেন প্লে থেকে তিনি শটে শেষ হওয়া আক্রমণের ধারায় ১৫১ বার যুক্ত ছিলেন, যা ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের মধ্যে ক্লদিয়া পিনা (১৯৯), ভিকি লোপেজ (১৮৩) ও জর্জিয়া স্ট্যানওয়ের (১৬৮) পর চতুর্থ সর্বোচ্চ।
স্প্যানিশ লিগে তিনি ৪০টি গোলের সুযোগ তৈরি করেন এবং ৭টি অ্যাসিস্ট নথিভুক্ত করেন। সব মিলিয়ে গত মৌসুমে তিনি ৮৯টি গোলের সুযোগ তৈরি করেন, যার মধ্যে ১৯টি ছিল বড় সুযোগ এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগের শেষ এক-তৃতীয়াংশে সফল পাস দেন ৯৬৫টি। এই দুই ক্ষেত্রে স্প্যানিশ লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ, কোপা দে লা রেইনা ও স্প্যানিশ সুপার কাপের কোনো খেলোয়াড় তাঁর চেয়ে এগিয়ে ছিলেন না। কখনো মাঝমাঠ থেকে এমন পাস দেন, যাতে প্রতিপক্ষের পুরো রক্ষণই এলোমেলো হয়ে যায়।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ৫০ দেশের সাংবাদিকদের ভোটে পুতেয়াসের হাতেই ওঠে বর্ষসেরার এই পুরস্কার। এই দৌড়ে দ্বিতীয় হন বার্সেলোনার স্ট্রাইকার এভা পায়োর এবং তৃতীয় স্থান পান ম্যানচেস্টার সিটির ফরোয়ার্ড খাদিজা শ। পুতেয়াসের এই ট্রফিতে আরও একটি মাইলফলক স্পষ্ট হলো, তাহলো মেয়েদের ব্যালন ডি’অরে স্পেনের টানা আধিপত্য। ২০২১ ও ২০২২ সালে টানা দুবার এই ট্রফি জেতেন পুতেয়াস, এরপর ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে জেতেন বোনমাতি। এবার আবার পুতেয়াস জয়ী হওয়ায় টানা ছয় বছর এই ট্রফি থাকল স্প্যানিশদের দখলে। ২০১৮ সালে নরওয়ের আডা হেগেরবার্গ এবং ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মেগান র্যাপিনো ছাড়া আর কোনো দেশের খেলোয়াড় এই সম্মান পাননি। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ৫০ দেশের সাংবাদিকদের ভোটে তাই তিনিই সেরা। মেসি এবার ব্যালন ডি’অরে পঞ্চম, অন্যরা কে কত নম্বরে।
শৈশবে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, রিভালদো ও রোনালদিনহোর খেলা দেখে ফুটবল প্রেমে পড়া পুতেয়াসের ক্যারিয়ারের পথটা সহজ ছিল না। তিনি শৈশবে জাভির ফুটবল ক্যাম্পে যোগ দিয়েছিলেন এবং স্থানীয় ক্লাব সিই সাবাদেল ও বার্সেলোনার বিখ্যাত একাডেমী লা মাসিয়ায় খেলেছেন। তবে তৎকালীন সময়ে বার্সেলোনার মেয়েদের দলটি বন্ধ হয়ে গেলে তিনি এসপানিওল ও লেভান্তেতে খেলেন। পরবর্তীতে ২০১২ সালে প্রিয় ক্লাব বার্সেলোনায় ফিরে আসেন এবং দীর্ঘ ১৪ বছর সেখানে কাটান। মেয়েটি মুগ্ধ হয়ে দেখত আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার পায়ের জাদু। রিভালদো আর রোনালদিনহোর ফুটবলও তাকে টানত চুম্বকের মতো। তারপর কেটে গেছে ১৪ বছর। ১৪ বছরের সম্পর্ক কি আর এত সহজে ছিন্ন করা যায়।
বার্সেলোনার হয়ে খেলা ১৪ বছরে পুতেয়াস মোট ৩৮টি ট্রফি জেতেন, যার মধ্যে ছিল ১০টি লিগ ও ৪টি চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা। কিন্তু ২০২৫-২৬ মৌসুম শেষে কাতালান ক্লাবটির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তিনি নতুন চ্যালেঞ্জের খোঁজে পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে জুনে ইংল্যান্ডকে ৪-০ গোলে হারিয়ে স্পেনকে ২০২৭ বিশ্বকাপে তোলার ম্যাচে তিনি জোড়া গোল করেন। অথচ সেই ইংল্যান্ডেরই ক্লাব লন্ডন সিটি লায়নেসেসে জুলাইয়ে তিনি যোগ দেন। মার্কিন ধনকুবের মিশেল কাংয়ের এই ক্লাবে যোগ দেওয়ার সময় কাঁদেন পুতেয়াস ও তাঁর ভক্তরা। এ যেন হারিয়ে যাওয়া এক শিল্পীর আবার নিজের রংতুলি ফিরে পাওয়ার কাহিনি। কিন্তু সব প্রেমের গল্পের শেষটা এক রকম হয় না।
যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও ইংল্যান্ডের বহু ক্লাবের প্রস্তাব থাকলেও ইংল্যান্ডের এই ক্লাবটি বেছে নেন তিনি। নতুন অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে আগস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, তিনি সবসময় ভালো কিছুর খোঁজে নিজেকে এবং নিজের খেলাকে এগিয়ে নিতে চান। নতুন ক্লাব লন্ডন সিটি লায়নেসেসের হয়ে প্রথম সাত লিগ ম্যাচেই তিনি ৩টি গোল ও ১টি অ্যাসিস্ট করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, ৩২ বছর বয়সেও তাঁর জাদুকরী ক্ষমতা আগের মতোই তাজা। আগস্টে বিবিসির ‘উইমেনস ফুটবল উইকলি’ পডকাস্টে পুতেয়াস বলেছিলেন, ‘আমি সব সময় আরও ভালো কিছুর দিকে তাকিয়ে থাকি। নতুন ক্লাবে প্রথম সাত লিগ ম্যাচে করেছেন ৩ গোল, অ্যাসিস্ট ১টি।
শিরোপা বা ব্যক্তিগত রেকর্ডের চেয়েও পুতেয়াসের ব্যালন ডি’অর জয়ের বক্তব্য অনুপ্রেরণাদায়ক বার্তা পৌঁছে দিয়েছে বিশ্বজুড়ে। মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, পৃথিবীর সব ছেলেমেয়ের উদ্দেশ্যেই তাঁর বার্তা—যদি কেউ ফুটবল ভালোবাসে, তবে তার খেলা উচিত। কে ছেলে বা কে মেয়ে, কিংবা কে কোথা থেকে এসেছে তা বড় কথা নয়; কেউ অসমর্থ বললে তা না শুনে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখাটাই আসল কথা। শৈশবের স্বপ্ন আর মাঝপথের ইনজুরি পেরিয়ে আসা ‘রানি’ পুতেয়াসের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটি এখন বিশ্ব ফুটবলের অনন্য এক দলিল।





