১১ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আজ ইসরায়েলে পার্লামেন্ট নির্বাচন: ভাগ্য নির্ধারণ হবে নেতানিয়াহুর

প্রকাশ:

গাজায় অভূতপূর্ব ধ্বংসযজ্ঞ, বিপুল ফিলিস্তিনিকে বাস্তুচ্যুত করা ও দুর্নীতির একাধিক মামলার বিচারপ্রক্রিয়ার জলঘোলা পরিস্থিতির মধ্যেই মঙ্গলবার ইসরায়েলে শুরু হয়েছে সাধারণ নির্বাচন। ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকা বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকবেন, নাকি রাজনৈতিক বিদায় নেবেন, তা নিয়ে দেশটিতে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্বে কোনো রদবদল এলেও ফিলিস্তিনিদের নিপীড়িত জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

এবারের নির্বাচনে দেশটির প্রায় ৭৩ লাখ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করছেন। ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটের মোট ১২০টি আসনে এই ভোটাভুটি চলছে। আইন অনুযায়ী কোনো একক দলকে ক্ষমতায় যেতে হলে ন্যূনতম ৬১টি আসনে জয় নিশ্চিত করতে হয়। তবে দেশটির নাগরিকরা সরাসরি কোনো প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীকে ভোট দেন না; তারা মূলত রাজনৈতিক দল বা জোটের তালিকায় ভোট প্রদান করেন। প্রাপ্ত মোট ভোটের আনুপাতিক হারের ভিত্তিতেই দলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টন করা হয়। তবে নেসেটে প্রবেশের যোগ্যতা অর্জন করতে প্রতিটি দলকে অবশ্যই কমপক্ষে ৩.২৫ শতাংশ ভোট পেতে হয়। দেশটির প্রধান দুই নির্বাচনী জোটের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটের ১২০ আসনে ভোট হচ্ছে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৬১ আসন।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক দল লিকুদকে সঙ্গে নিয়ে ডানপন্থী ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী দলগুলোর নেতৃত্বের আসনে রয়েছেন। এই জোটে তাঁর প্রধান শরিকদের মধ্যে রয়েছে কট্টর ডানপন্থী নেতা ইতামার বেন-গভিরের জিউইশ পাওয়ার এবং বেজালেল স্মোত্রিচের রিলিজিয়াস জায়োনিজম। প্রথমজন জাতীয় নিরাপত্তা এবং দ্বিতীয়জন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে রয়েছেন। এ ছাড়া অতি-রক্ষণশীল ইহুদি দল শাস এবং ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম নেতানিয়াহুকে সমর্থন জোগাতে পারে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে বিরোধী শিবিরের দলগুলো, যার মধ্যে রয়েছে ইয়াশার, টুগেদার, ইসরায়েল বেইতেনু এবং ডেমোক্র্যাটস। বিরোধী জোট জয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী পদে কাকে দেখা যাবে, তা নির্দিষ্ট করে জানানো না হলেও সাবেক সেনাপ্রধান ও ইয়াশার প্রধান গাদি আইজেনকট, টুগেদারের নাফতালি বেনেট ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়ার লাপিদের নাম আলোচনায় রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ভোটের মূল লড়াইয়ে লিকুদ ও ইয়াশার উভয় দলই ২২টি করে আসন পেতে পারে। টুগেদার ১৪টি এবং ডেমোক্র্যাটস ও জয়েন্ট লিস্ট পেতে পারে ৯টি করে আসন। জিউইশ পাওয়ার, শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম প্রতিটি ৮টি এবং ইসরায়েল বেইতেনু ও রিলিজিয়াস জায়োনিজম পেতে পারে ৭টি করে আসন। এ ছাড়া রা’আম পেতে পারে ৫টি আসন। এতে হিসাব দাঁড়ায় নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেতে পারে ৫৩টি আসন এবং বিরোধী জোট পেতে পারে ৫২টি আসন। অর্থাৎ কোনো পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত ইসরায়েলিদের প্রতিনিধিত্বকারী আরব দলগুলো সরকার গঠনের ক্ষেত্রে কিংমেকারের ভূমিকা পালন করতে পারে, যদিও অধিকাংশ বিরোধী দল ইতিমধ্যেই তাদের সঙ্গে জোট বাঁধার কথা নাকচ করেছে। কোনো দল সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারলে ফের নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুই হয়তো অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রয়ে যাবেন। এখন পর্যন্ত ছয় মেয়াদে ইসরায়েলকে নেতৃত্ব দেওয়া নেতানিয়াহু জয়ী হলে সপ্তমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী পদে বসবেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সামরিক অভিযানের পর ইসরায়েলে এটিই প্রথম সংসদীয় নির্বাচন। হামলার আগাম তথ্য না পাওয়া এবং দেশের সার্বিক নিরাপত্তাব্যর্থতার দায় নিয়ে নেতানিয়াহু বরাবরই উদাসীন থাকলেও নাগরিক সমাজ ও বিরোধীরা চরম ক্ষুব্ধ। এ ছাড়া ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের জন্য সামরিক সেবা থেকে অব্যাহতির রেওয়াজ নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে গভীর অসন্তোষ রয়েছে। গাজার বাস্তুচ্যুত নাগরিক মোহাম্মদ ইলিয়ান আল-জাজিরাকে সাক্ষাৎকার দেওয়ার সময় জানান, রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিবর্তন এলে বা নেতানিয়াহুর পরাজয় ঘটলেও ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের সহিংস নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসবে না, তা সত্ত্বেও তিনি নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক বিদায়ই দেখতে চান।

শেয়ার করুন