প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরকে সামনে রেখে টোকিওতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলীকে ঢাকায় তলব করা হয়েছে। সাধারণত কোনো দেশের প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় সফরের সময় সংশ্লিষ্ট দেশের রাষ্ট্রদূত আয়োজক দেশ ও সফরকারী দলের মধ্যে সমন্বয় ও প্রস্তুতির মূল দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু দাউদ আলীর ক্ষেত্রে এমনটি ঘটছে না, যা বিশ্ব কূটনীতির ইতিহাসে বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের প্রাক্কালে রাষ্ট্রদূতকে সরিয়ে আনার পেছনে বড় কোনো কারণ রয়েছে বলে ধারণা করছেন ওয়াকিবহাল মহল। প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রাক্কালেই কেন এমন সিদ্ধান্ত নিতে হলো। এ ছাড়া চীনের কুনমিংয়ে বাংলাদেশ কনস্যুলেটে কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তার।
কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় যৌথ বিবৃতিতে যুক্ত হওয়া একটি নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ নিয়ে জাপানের আপত্তি ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং সামরিক পুনরুত্থানের বিরোধিতা সম্বলিত ওই অনুচ্ছেদটি জাপানের জন্য স্পর্শকাতর। টোকিও মনে করে, এই অনুচ্ছেদটি তৈরিতে দাউদ আলীর ভূমিকা ছিল এবং তাকে চীনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবেও দেখে জাপান। এছাড়া, দুই দেশের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিগুলোর গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টিও এই সিদ্ধান্তের পেছনে থাকতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সফরসংক্রান্ত প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের কাজ থেকেও তাকে দূরে রাখা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ও যুদ্ধের পরিণতি নিয়ে ওই অনুচ্ছেদের বক্তব্য নিজেদের জন্য স্পর্শকাতর মনে করে টোকিও। একই সময়ে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে।
১৫ই অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক নির্দেশনায় তাকে ঢাকায় ফেরার নির্দেশ দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে প্রস্তুতির দায়িত্বে পররাষ্ট্র সচিব মো. নজরুল ইসলামকে টোকিও পাঠানো হয়েছে। ২৬ থেকে ২৯শে অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দক্ষ কর্মী প্রেরণসহ ৮টি সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। যার মধ্যে ৩ থেকে ৪টি স্মারক সই হতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। প্রধানমন্ত্রীর বিদেশ সফরের আগে রাষ্ট্রদূতকে এভাবে সরিয়ে দেয়াকে সাবেক ও বর্তমান কূটনীতিকদের অনেকে অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেছেন। যার মধ্যে- ৩ থেকে ৪ টি সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম।
দাউদ আলীর বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপ এবারই প্রথম নয়। ২০০৯ সালে লন্ডনে হাইকমিশনের কাউন্সেলর থাকাকালীন তার বিরুদ্ধে তারেক রহমানকে সহায়তার অভিযোগ উঠেছিল। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের প্রেক্ষিতে সে সময় তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে এনে পররাষ্ট্র সার্ভিস একাডেমির ভাইস প্রিন্সিপাল করা হয়েছিল। প্রায় ১৭ বছর পর প্রধানমন্ত্রীর সফরের আগে আবারও একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেন এই কূটনীতিক। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ বিষয়ে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জমা পড়েছিল।
বর্তমানে বিসিএস ১৫তম ব্যাচের পররাষ্ট্র ক্যাডারের এই কর্মকর্তার অবসরোত্তর ছুটি (পিআরএল) আগামী ৭ই ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়ার কথা। ২০২৪ সালের ১২ই ডিসেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি জাপানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। এর আগে তিনি রোমানিয়ায় রাষ্ট্রদূত এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (কনস্যুলার ও কল্যাণ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তার কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় টোকিও, প্রিটোরিয়া, লন্ডন ও কুনমিং মিশনে অতিবাহিত হয়েছে।





