৭ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ড্রোন ব্যবহার করে অবিশ্বাস্য উপায়ে ইউক্রেনীয় সেনার প্রাণরক্ষা

প্রকাশ:

ইউক্রেনের ৪৯ বছর বয়সি সেনা কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো প্রায় আট মাস ধরে এক ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলের বয়লারঘরের নিচের ছোট্ট একটি গর্তে বন্দি জীবন কাটিয়েছেন। চারপাশে শত্রুর ড্রোন, উদ্ধারে গেলেই মৃত্যুর ঝুঁকি—এমন পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার আশাও ছেড়ে দিয়েছিলেন ইউক্রেনের ৪৯ বছর বয়সি সেনা কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো। ভ্লাসেনকো বলেন, ‘তখনই বুঝতে পেরেছিলাম, এটাই সম্ভবত সবকিছু বদলে দেওয়ার মুহূর্ত।

শত্রুবেষ্টিত সেই ভয়াবহ অবস্থায় তিনি দুই পা হারিয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন।

শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তির এক অনন্য উদ্ভাবন, বিশাল এক মালবাহী ড্রোনের সহায়তায় তাকে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়। এখান থেকে আর কেউ বের হতে পারবে না।’। ড্রোনটির ছয়টি উল্লম্ব রোটর এবং কালো কাঠামো দেখতে বিশাল কোনো পোকামাকড়ের মতো।

গত ৪ অক্টোবর সম্পন্ন হওয়া এই উদ্ধার অভিযান ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে আকাশপথে ড্রোনের মাধ্যমে কোনো সেনাকে উদ্ধারের প্রথম ঘটনা হিসেবে দাবি করছে ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী। তার ভাষায়, ‘তখন আমার আর কোনো পা অবশিষ্ট ছিল না।’।

ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের মে মাসে, যখন ভ্লাসেনকো ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের সদস্য হিসেবে খারকিভ অঞ্চলের এক সম্মুখসারির অবস্থানে দায়িত্ব পালন করতে যান।

সেখানে তার সঙ্গে ছিলেন ‘বাসকি’ নামের আরেক সেনাসদস্য।

প্রতিদিন ড্রোনের মাধ্যমে খাবার ও রসদ সরবরাহ পেলেও, তাদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাটি ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। কিন্তু ওই অবস্থান থেকে সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে।

উদ্ধার করতে আসা একাধিক সেনা রুশ হামলায় প্রাণ হারান। এরপর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে বাংকারে পানি ঢুকে পড়লে তারা কাছের একটি বিধ্বস্ত স্কুলের দিকে সরে যান। ছোট্ট একটি মাটির বাংকারে তাদের থাকতে হতো। প্রায় ১০ মাস একসঙ্গে থাকার পর গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তাদের বাংকারে পানি ঢুকে পড়ে। পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন ডান পায়েও।

স্কুলের বাইরে বেরিয়ে শুকনো কাপড় সংগ্রহের সময় রুশ ড্রোন তাদের শনাক্ত করে এবং হামলা চালায়। সেই আক্রমণে বাসকি নিহত হন এবং ভ্লাসেনকোর দুই পা মারাত্মকভাবে জখম হয়। চলাচলের শক্তি হারিয়ে তিনি প্রায় ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটারের একটি গর্তে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। একপর্যায়ে সংক্রমণের আশঙ্কায় তিনি নিজেই ছুরি দিয়ে নিজের ক্ষতবিক্ষত পায়ের পাতা বিচ্ছিন্ন করেন। রক্তপাত বন্ধ করতে তিনি টুর্নিকেট ব্যবহার করেন। প্রায় আট মাস তিনি সেই বদ্ধ গর্তে কার্যত মৃতপ্রায় অবস্থায় দিন কাটিয়েছেন। ড্রোন হামলায় এক পা উড়ে গেছে, অন্য পাটিও বাঁচাতে নিজেই ছুরি দিয়ে কেটে ফেলেছেন। তার দুই পায়ের কাটা অংশ তখনও ব্যান্ডেজে মোড়ানো। এমনকি ভ্লাসেনকোর জন্মদিনে চকলেট ও দামি সিগারেটও পাঠানো হয়েছিল। বিস্ফোরণে ভ্লাসেনকোর বাঁ পায়ের পাতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। চলাফেরার ক্ষমতা প্রায় হারিয়ে ফেলা ভ্লাসেনকো আশ্রয় নেন স্কুলের পুরোনো বয়লারের নিচে থাকা প্রায় ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার আকারের একটি গর্তে। ধীরে ধীরে তার বাঁ পায়ের ক্ষতস্থানের অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকে। হাড়ও ক্রমেই আরও বেশি বেরিয়ে আসছিল।’।

সেই এলাকাটি ‘কিল জোন’ হিসেবে পরিচিত ছিল, কারণ ড্রোন পাহারার কারণে স্থলপথে উদ্ধার অভিযান চালানো প্রায় অসম্ভব ছিল। পূর্বে পাঠানো দুটি চালকবিহীন যান রুশ হামলায় ধ্বংস হওয়ার পর উদ্ধারকারীরা নতুন কৌশলের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হন। তারা গুরজুফ ডিফেন্সের তৈরি একটি বিশেষ ছয় প্রপেলারের ভারী ড্রোন ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেন, যা সর্বোচ্চ ৯০ কেজি ওজন বহন করতে সক্ষম। এটি সর্বোচ্চ ৯০ কেজি ওজন বহন করে প্রায় ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়তে পারে। কারণ, আকাশজুড়ে অসংখ্য ড্রোন টহল দেওয়ায় সেখানে সামান্য নড়াচড়াও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

উদ্ধারকারী অ্যালেক্স ও তার দল অভিযানের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। ভ্লাসেনকোকে দেওয়া হয় একটি নিরাপত্তা বেল্ট বা হারনেস এবং নির্দেশনা সম্বলিত ফোন। ৪ অক্টোবর ড্রোনটি সেখানে পৌঁছালে ভ্লাসেনকো হারনেসের সাহায্যে নিজেকে আটকে নেন। ড্রোনটি তাকে ৭০ মিটার উচ্চতায় তুলে ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে উড়াল দেয়। অভিযানে শত্রু ড্রোনগুলোকে বিভ্রান্ত করতে আরও তিনটি ছোট ড্রোন এবং চারটি ইউক্রেনীয় এফপিভি ড্রোন ও কামানের সহায়তায় দুই ঘণ্টা ব্যাপী কভার ফায়ার দেওয়া হয়। মাটি থেকে ৭০ মিটার ওপরে ঝুলিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে। তিনি বলেন, ‘আমি নিজেকে আগেই মৃত ভেবে নিয়েছিলাম। এরপর ড্রোনটি তাকে প্রায় ৭০ মিটার বা ২৩০ ফুট উচ্চতায় তুলে নেয়।

প্রায় ১৫ মিনিটের ঝুঁকিপূর্ণ উড্ডয়ন শেষে ভ্লাসেনকো নিরাপদে পৌঁছান। আকাশপথে উদ্ধার হওয়ার সময় মৃত্যুর ভয় ছাপিয়ে তার মনে অদ্ভুত এক ভীতি ছিল, তিনি ভয় পাচ্ছিলেন যে পানিতে পড়ে যাবেন কারণ তিনি সাঁতার জানতেন না। বর্তমানে খারকিভের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা ভ্লাসেনকোর এই বিরল অভিজ্ঞতার বর্ণনা ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর ভিডিও ফুটেজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ৪৯১ দিন সম্মুখসারিতে কাটানো এই সেনার বেঁচে ফেরা এখন অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য ঠেকছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভের একটি হাসপাতালে শুয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান ভ্লাসেনকো। দীর্ঘদিন সম্মুখসারিতে থাকার কারণে ভ্লাসেনকোর ওজন কমে আনুমানিক ৭০ কেজিতে নেমে এসেছিল বলে ধারণা করেছিলেন কর্মকর্তারা।

শেয়ার করুন