৪ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জেলেনস্কি |: ইউক্রেনকে রাশিয়ার কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য করছেন ট্রাম্প

প্রকাশ:

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তিনি দাবি করেছেন, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন ইউক্রেনকে রাশিয়ার কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার জন্য পরিকল্পিতভাবে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ব্লুমবার্গ নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি স্পষ্ট করেন, তিনি বিশ্বাস করেন ইউক্রেনের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার লক্ষ্যেই ওয়াশিংটন কাজ করছে। যদিও তিনি এমনটা বিশ্বাস করতে চান না, কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি সেই বার্তাই দিচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জেলেনস্কির মতে, ট্রাম্পের স্বৈরশাসকদের প্রতি এক ধরনের সহজাত অনুরাগ রয়েছে, যা রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার সম্পর্কের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট।

গত ৯ অক্টোবর থেকে দুই নেতার মধ্যে কথার লড়াই তীব্রতর হয়েছে। গত সপ্তাহজুড়ে দুই নেতার মধ্যে নজিরবিহীন কঠোর ভাষায় পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এসেছে।

ট্রাম্প জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল কেনার পরিকল্পনার কথা জানালে ইউক্রেনীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া একাধিক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন তিনি।

এছাড়া ট্রাম্প ইউক্রেনকে রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন, যা যুদ্ধের ক্ষেত্রে রাশিয়ার ওপর চাপ সৃষ্টির প্রধান একটি কৌশল। ট্রাম্প সরাসরি জেলেনস্কির সমালোচনা করে বলেছেন, তিনি এই যুদ্ধ শেষ করতে চান না। ট্রাম্পের যুক্তি, ইউক্রেন হামলা বন্ধ করলে রাশিয়ার তেল আবারও বিশ্ববাজারে আসতে পারবে। শান্তিচুক্তির আলোচনায় ক্রেমলিনকে উৎসাহিত করতে কেন বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি জেলেনস্কির সমালোচনা করেন। দেশটির আশঙ্কা, ট্রাম্প পুতিনকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করছেন।

যুদ্ধের ময়দানেও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন জেলেনস্কি। তিনি অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটন ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহে গড়িমসি করছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চাহিদা মেটাতে গিয়ে ইউক্রেনের জন্য বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়ায় কিয়েভ এখন বড় ধরনের নিরাপত্তা সংকটে পড়েছে। এর ফলে রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলায় ইউক্রেনের সক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। সম্মুখসারির যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ স্যাটেলাইট ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বাধানিষেধ আরোপের অভিযোগ তুলেছে কিয়েভ। সম্মুখসারির সামরিক অভিযান পরিচালনায় এ নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ।

গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান নিয়েও দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, গত সপ্তাহে রাশিয়ার দুটি বড় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে কোনো পূর্বসতর্কবার্তা পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে গত রোববার রাত ১১টার দিকে কিয়েভে যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে, সেটির বিষয়েও আগে থেকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি বলে জেলেনস্কি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে দাবি করেছেন, এটি কোনো ইচ্ছাকৃত তথ্য গোপন নয়, বরং ইউক্রেনের নিজস্ব আগাম সতর্কীকরণ সফটওয়্যারের ত্রুটি হতে পারে। জেলেনস্কি বলেন, রোববার রাতেও একই ঘটনা ঘটেছে।

এদিকে ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর তথ্যমতে, রোববার রাত ও সোমবার ভোরে রাশিয়া কিয়েভ ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ১৬টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ২৭০টি ড্রোন নিক্ষেপ করেছে। এর মধ্যে ২৪০টিরও বেশি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে সংখ্যা না জানালেও কিয়েভ এখন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের হার প্রকাশ্যে না জানানোর নতুন নীতি গ্রহণ করেছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই শোনা যাচ্ছে, আগামী মাসে চীনের শেনজেনে ট্রাম্প, পুতিন ও সি চিন পিংয়ের একটি ত্রিদেশীয় বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে, যা কিয়েভের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। অন্যদিকে ট্রাম্প ইউক্রেনের জনগণকে জেলেনস্কিকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। কয়েক মাস ধরে এ বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার পর এবারই প্রথম তিনি প্রকাশ্যে এমন ইঙ্গিত দিলেন। তার এ বক্তব্যে ইউক্রেনে উদ্বেগ আরো বেড়েছে।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপের মুখে জেলেনস্কি। এনবিসি টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে তিনি আভাস দিয়েছেন যে, যুদ্ধ চলাকালেই যদি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তবে তিনি তাতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। যদিও যুদ্ধের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা এবং সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক অনিশ্চয়তা ও বিরোধ রয়েছে। রাশিয়াও বারবার যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ভোটগ্রহণের সুযোগ দিতে অস্বীকার করে আসছে। তবে যুদ্ধের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের সম্ভাবনাকে তিনি গুরুত্বহীন করে দেখান। এ ছাড়া যুদ্ধ চলাকালে নির্বাচন আয়োজনের বিরোধিতা করেন ইউক্রেনের বিপুলসংখ্যক নাগরিক।

কিয়েভের বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। আকাশ প্রতিরক্ষার অভাব এবং একের পর এক হামলার মধ্যেও সেখানকার মানুষের মনোবল অটুট রাখার চেষ্টা চলছে। ১৯৬২ সালে রচিত ইউক্রেনের রাজধানীর প্রতি নিবেদিত একটি বিখ্যাত গীতিময় গান এখন শহরের প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে। রাতের বেলা যখন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা লক্ষ্যভেদে ব্যর্থ হয়, তখন শহরের বিভিন্ন অ্যাপার্টমেন্ট থেকে সেই গান বেজে ওঠে, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত নাগরিকদের বেঁচে থাকার সাহস জোগায়।

শেয়ার করুন