দেশে হামের সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছয় মাস থেকে নয় বছর বয়সী শিশুদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে টিকা দেওয়ার জোরালো সুপারিশ করেছে ৭০ সদস্যের একটি যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ এবং টিকা সংগ্রহ ও বিতরণের আন্তর্জাতিক মঞ্চের প্রতিনিধি ও দেশি জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত এই দলটি দুই সপ্তাহের মধ্যে টিকা না পাওয়া শিশুদের খুঁজে বের করে তাদের সুরক্ষার আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছে। বিশেষ করে উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ জেলাগুলোতে এই কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন করতে বলা হয়েছে। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) ও টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগ নজরদারি পর্যালোচনার অংশ হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত ৭০ সদস্যের যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দল এসব সুপারিশ করেছে। গত বুধবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত এক কর্মশালায় এই মূল্যায়ন উপস্থাপন করা হয়। সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন বলেন, ‘যৌথ স্বাধীন মূল্যায়ন দলের সুপারিশ প্রায় সবগুলোই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিগত আড়াই দশকে টিকাদানের ধারাবাহিকতায় ব্যর্থতার কারণেই বর্তমানে হামের প্রাদুর্ভাব বিস্ফোরণ ঘটেছে। ২০০০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিপুলসংখ্যক শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়া এবং গত বছর হাম-রুবেলার টিকার মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এর পাশাপাশি নিয়মিত টিকা না পাওয়ার ফলে দুই বছরের বেশি বয়সী শিশুদের মধ্যেও ঝুঁকি বাড়ছে। এ ছাড়া দেশের জনঘনত্ব ও প্রাদুর্ভাবে অপর্যাপ্ত সাড়ার কারণে প্রাদুর্ভাব এ পর্যায়ে এসেছে। আমরাও শিশুদের টিকাদানের বয়স বাড়ানোর কথা বলে আসছি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৩৬৬ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল আটটা থেকে রোববার সকাল আটটা পর্যন্ত) হামের উপসর্গ নিয়ে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হামে মোট ১ হাজার ১৯৬ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। আক্রান্তদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার। এমনকি ২১ দিন বয়সী নবজাতকের হামে আক্রান্ত হওয়া এবং আক্রান্ত ১৫ বছর বয়সী মায়ের জীবনে কখনো টিকা না নেওয়ার তথ্য পরিস্থিতি কতটা নাজুক তা স্পষ্ট করে। এ সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ১ হাজার ৩১৯ জন। ‘হাম-ডেঙ্গু দুটোতেই আক্রান্ত, ডাক্তার দেখে বলছে পজিশন খারাপ’।
হাম মোকাবিলায় মূল্যায়ন দলের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে শিশুদের বয়সসীমা দুই বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা। এছাড়া বর্তমান প্রাদুর্ভাব শেষ না হওয়া পর্যন্ত ছয় মাস বয়সী শিশুদের হাম-রুবেলার টিকা দেওয়া এবং তাদের আইসোলেশনে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী জাতীয় ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা সময়মতো সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে, যা ২০২৯ বা ২০৩০ সালের দিকে হতে পারে। সম্ভবত সেই ক্যাম্পেইন হবে ২০২৯ বা ২০৩০ সালে। তবে হাম মোকাবিলায় কমিউনিটির সম্পৃক্ততার কথা সুপারিশে নেই, মনে হয় কিছুটা গুরুত্ব কম পেয়েছে।
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনার উন্নতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সন্দেহভাজন রোগীর নাম, ঠিকানা ও বয়সসহ যাবতীয় তথ্য সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ চর্চা বাধ্যতামূলক করা এবং রোগীদের জন্য হালনাগাদ ব্যবস্থাপনা নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। এছাড়া বিদ্যালয়ে ভর্তির সময় শিশুদের টিকার কার্ড যাচাই করার প্রক্রিয়া চালু করার কথাও বলা হয়েছে, যাতে কোনো শিশু টিকাদান থেকে বাদ না পড়ে। সরকার ধারণা করেছিল, টিকার মাধ্যমে তারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। পরবর্তী সময়ে সব বয়সের উপযুক্ত মানুষের টিকার ব্যবস্থা করার কথা বলেছে।
জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন জানান, বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিটি সুপারিশই অত্যন্ত জরুরি। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, টিকা দেওয়ার পাশাপাশি কমিউনিটির সম্পৃক্ততা বাড়ানো না গেলে এবং দরিদ্র পরিবারগুলোকে আর্থিক বা ওষুধের সহায়তা না দিলে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নেওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনা না গেলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ চ্যালেঞ্জিং হবে। ছয় মাসের কাছাকাছি বয়সী শিশুকে টিকা দেওয়ার পাশাপাশি পৃথক করে রাখতে হবে।
দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষার জন্য মাঠপর্যায়ের এবং প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করতে গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি, যেসব শিশু দীর্ঘ সময় ধরে টিকাদান থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে, তাদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে টিকাদান পরিকল্পনা হালনাগাদ করতে বলা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ৫ এপ্রিল শুরু হয়ে ২০ মে পর্যন্ত হাম-রুবেলা টিকার জাতীয় ক্যাম্পেইন চলে। এরপরও প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে না আসায় স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে টিকা দেওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা হামের নজরদারি ও প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন।





