ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে কারণ তাদের হাতে থাকা মার্কিন নির্মিত প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় শেষ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র সিএনএনকে জানিয়েছে, রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার মতো পর্যাপ্ত সরবরাহ এখন আর কিয়েভের হাতে নেই। এমন একটি জটিল মুহূর্তে এই সংকট তৈরি হলো যখন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যকার প্রকাশ্য বিরোধ ক্রমাগত তীব্রতর হচ্ছে। সর্বশেষ রাশিয়ার হামলায় প্রায় সব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি, যার মূল কারণ ছিল এই প্রয়োজনীয় ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি। বুধবারের ওই হামলায় কিয়েভে চারজন নিহত ও ২৫ জন আহত হয়েছেন, এছাড়া কিয়েভের তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ও খারকিভের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত বুধবার ভোররাত থেকে সকাল পর্যন্ত চালানো ওই হামলায় রাশিয়ার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কিয়েভের তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে আঘাত হানে।
এই উত্তেজনার পেছনে রয়েছে ইউক্রেনের যুদ্ধ নিয়ে দুই নেতার ভিন্নমত। ট্রাম্প রাশিয়ার তেল অবকাঠামোয় হামলা বন্ধ করতে ইউক্রেনের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছেন এবং রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল আমদানির বিষয়ে একটি চুক্তি করেছেন। এতে জেলেনস্কি নিজেকে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার বলে মনে করছেন, তবুও তিনি রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে হামলা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তে অনড়। হোয়াইট হাউসের হুঁশিয়ারি অনুযায়ী, কিয়েভ যদি রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় দূরপাল্লার হামলা বন্ধ না করে, তবে ইউরোপের কাছে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে। যদিও ট্রাম্প পরবর্তীতে দাবি করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বন্ধ করা হয়নি।
প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ইউক্রেনের সামরিক কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে নতুন জটিলতা। ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের স্টারলিংকের সামরিক সংস্করণ ‘স্টারশিল্ড’-এর কার্যকারিতা সীমিত হওয়ায় ইউক্রেনীয় বাহিনী বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এর ফলে জেটচালিত ড্রোন প্রতিহত করা, রসদ সরবরাহ ও সামরিক অভিযান পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটছে। যদিও বৃহস্পতিবার নাগাদ স্টারশিল্ডের কার্যক্রম আংশিকভাবে স্বাভাবিক হয়েছে, তবুও দ্রুতগতির সামরিক সরঞ্জাম পরিচালনার ক্ষেত্রে সমস্যা রয়ে গেছে। ইলন মাস্ক এ বিষয়ে তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছেন, স্টারশিল্ডের নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানা মার্কিন সরকারের হাতে এবং এর ব্যবহার সীমিত করার সিদ্ধান্তটি যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ও প্রেসিডেন্টের এখতিয়ারভুক্ত। এমনকি মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারাও সরাসরি ইউক্রেনের কমান্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
অস্ত্র সংকটের এই পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক, কারণ এসব ক্ষেপণাস্ত্র বেশ ব্যয়বহুল এবং বিশ্ববাজারে এগুলোর সরবরাহও সীমিত। ইরান যুদ্ধের কারণে বিভিন্ন দেশ নিজেদের মজুত বাড়িয়ে নেওয়ায় বিশ্ববাজারে সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও পেন্টাগন ইউক্রেন ও ইউরোপের মিত্রদের কাছে পিইউআরএল বা ‘প্রায়োরিটাইজড ইউক্রেন রিকোয়ারমেন্টস লিস্ট’ ব্যবস্থার মাধ্যমে সরবরাহ বন্ধের হুমকি পাঠিয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সব মিলিয়ে একদিকে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং অন্যদিকে মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে টানাপোড়েন—এই দুইয়ের চাপে ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্প বিশ্ববাজারে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির জন্য ক্রমবর্ধমানভাবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে দায়ী করছেন। যদিও জ্বালানির দাম বৃদ্ধিতে ইরান যুদ্ধের প্রভাব আরও বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।





