২১ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্রহ্মপুত্র নৌপথে বাংলাদেশে এলো ৫৪০ টন মিথানল

প্রকাশ:

দেশভাগের দীর্ঘ বিরতি শেষে ডিব্রুগড় ও ঢাকার মধ্যে ঐতিহাসিক নৌপথটি আনুষ্ঠানিকভাবে আবারও সক্রিয় হয়েছে। এই রুটের পুনরুজ্জীবনের অংশ হিসেবে সোমবার ভারতের ডিব্রুগড় থেকে ৫৪০ টন মিথানল নিয়ে একটি জাহাজ বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। ব্রিটিশ আমলে চা, কাঠ ও কয়লা পরিবহনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত এই পথটি ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৫৬ সালে ব্রহ্মপুত্র নদীবন্দরও কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমানে বাংলাদেশ, হয়ে যাওয়া এই নৌপথটি ১৯৪৭ সালে বন্ধ হয়ে গেলেও অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডিব্রুগড়ের ব্রহ্মপুত্র বন্দর বন্ধ হয় ১৯৫৬ সালে। সনোয়াল বলেন, ভারতের চা রাজধানী হিসেবে পরিচিত ডিব্রুগড় একসময় যে মহান নদীবন্দর হিসেবে গৌরব অর্জন করেছিল, তা আবার ফিরে পাচ্ছে। বর্তমান বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যেই এই ঘটনাকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা।

ভারতের কেন্দ্রীয় নৌপরিবহন ও জলপথমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল বগীবিল থেকে ‘ডিএলবি পাতকাই’ নামক মিথানলবাহী জাহাজটির যাত্রার উদ্বোধন করেন। ভার্চুয়ালি এই আয়োজনে যুক্ত ছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। সনোয়াল বলেন, ডিব্রুগড় ঘাটে স্টিমারের বাঁশির শব্দ শুনত আমাদের পূর্বসূরিরা। প্রায় ৭০ বছর পর সেই হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা হয়েছে। নদীপথে পণ্য পরিবহনে জ্বালানি সাশ্রয় হয় এবং সড়কপথের ওপর ট্রাকের চাপ কমে, যা পরিবেশের জন্য ইতিবাচক।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানান, উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো এখন ভারতের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে। ব্রহ্মপুত্র নদকে বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর করিডর হিসেবে ব্যবহারের এই পরীক্ষামূলক উদ্যোগ ভবিষ্যতে নিয়মিত মিথানল চালানের পথ প্রশস্ত করবে। মূলত সম্প্রতি বগীবিল ও ধুবড়িতে কাস্টমস ও অভিবাসন সুবিধা চালু হওয়ায় আন্তর্জাতিক এই পণ্য পরিবহন সম্ভব হয়েছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চল এখন আর সীমান্তবর্তী অঞ্চল নয়। এটি পূর্বাঞ্চলের দিকে ভারতের প্রবেশদ্বার।

ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১৮৫৬ সাল থেকে কলকাতা ও ডিব্রুগড়ের মধ্যে স্টিমার চলাচল করত। ১৯৫০ সালের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পে নদীর তলদেশের পরিবর্তনের ফলে ১৯৫৪ সালে পণ্য বুকিং বন্ধ হয় এবং ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর বন্দরটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের ফলে আন্তঃসীমান্ত নৌবাণিজ্য পুরোপুরি স্তব্ধ হয়। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে প্রটোকল স্বাক্ষরের পর ১৯৮৮ সালে ব্রহ্মপুত্রের ৮৯১ কিলোমিটার পথকে ‘জাতীয় জলপথ-২’ ঘোষণা করা হয়। তবে নিয়মিত পণ্যবাহী নৌচলাচল শুরু হতে সময় লেগেছে কয়েক দশক। ২০১৭ সালে সিমেন্ট পরিবহনের মধ্য দিয়ে এর যাত্রা শুরু হয় এবং ২০২২ সালে টাটা স্টিলের বার্জ পান্ডু বন্দরে পৌঁছায়। ২০২৩ সালে নদীভ্রমণ জাহাজ ‘এমভি গঙ্গা বিলাস’ একই রুট ব্যবহার করে। কয়েক দশক ধরে যা ছিল না, তা হলো এটিকে পুনরুজ্জীবিত করার ইচ্ছা।

সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বগীবিল যাত্রী ও পণ্য টার্মিনাল চালু হয়। ভারতের জাতীয় জলপথে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ ২০১৩-১৪ অর্থবছরের ১ কোটি ৮০ লাখ টন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২১ কোটি ৮০ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে। এই খাতের উন্নয়নে ভারত সরকার ৭৭ কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করছে, যার আওতায় পান্ডুতে জাহাজ মেরামতের সুবিধা এবং বন্দর অবকাঠামো উন্নয়ন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বর্তমানে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান ও মিয়ানমারের মধ্যে আঞ্চলিক জলপথ যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সমন্বিত কাজ চলছে। আমরা বিশ্বমানের অবকাঠামো গড়ে তুলছি এবং একই সঙ্গে এর ঐতিহ্যও সংরক্ষণ করছি।

শেয়ার করুন