২০ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

এক বছরের মধ্যেই পুঁজিবাজারের চেহারা বদলে যাবে: অর্থমন্ত্রী

প্রকাশ:

দেশের পুঁজিবাজারকে এক ধরনের ‘রেসকিউ’ বা উদ্ধার এবং ‘স্যালভেজ’ অপারেশনের মাধ্যমে ঘুরে দাঁড় করানোর কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন, বর্তমান সংস্কার কার্যক্রমের ফলে এক বছরের মধ্যেই পুঁজিবাজারের আমূল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাবে। রবিবার (৪ অক্টোবর) রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বিশ্ব বিনিয়োগকারী সপ্তাহ ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকনির্ভর অর্থায়ন ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত ঝুঁকে আছে। বিনিয়োগকারী, সরকার ও বেসরকারি খাত—সবাই মূলত ব্যাংকের দিকে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু স্বল্পমেয়াদি আমানত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়ার এই কাঠামোতে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে পুঁজিবাজার, বন্ড মার্কেট ও অন্যান্য আর্থিক উপকরণের মাধ্যমে অর্থায়নের একটি শক্তিশালী নতুন কাঠামো তৈরি করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পরিস্থিতি বদলাতে সরকার প্রয়োজনে কঠোর ও বেদনাদায়ক সিদ্ধান্ত নিতেও প্রস্তুত রয়েছে। অথচ স্বল্পমেয়াদি আমানতের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়ায় কাঠামোগত অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।

পুঁজিবাজারের দীর্ঘদিনের অবহেলার কথা উল্লেখ করে আমির খসরু বলেন, অতীতে অবকাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের চেষ্টা হলেও কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসেনি। এখন অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পুঁজিবাজারকে সংকট থেকে তুলে আনার কাজ চলছে। তিনি মনে করেন, এটি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব নয়; বরং বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, আইডিআরএ, এনবিআর এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেমের আওতায় কাজ করতে হবে। বিভিন্ন সময়ে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, অবকাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন আনা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তাই ‘হাই স্ট্রিট ব্যাংকিং’ থেকে বের হয়ে ‘ওয়াল স্ট্রিটে’ যেতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুঁজিবাজারকে বিকল্প অর্থায়নের প্রধান পথ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএসইসি, আইডিআরএ ও এনবিআরের চার নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাসিক সমন্বয় সভাও শুরু হয়েছে।

বিনিয়োগকারীদের আস্থার বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, পুঁজিবাজারকে ‘ক্যাসিনো’ বা জুয়ার আখড়া নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের নির্ভরযোগ্য গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ব্রোকার, স্টক এক্সচেঞ্জ ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদেরই নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য পূরণে উন্নয়ন সহযোগীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব বাজার থেকে তহবিল সংগ্রহের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। বিদেশে ডলার বন্ড, পাণ্ডা বন্ড, সামুরাই বন্ড ও ইকুইটি ফান্ডের মাধ্যমে অর্থায়ন সংগ্রহের পরিকল্পনাও তুলে ধরেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী তানভীর শাহরিয়ার ঘানি অনুষ্ঠানে জানান, গত চার মাসে বাজারে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি তালিকাভুক্তির নিয়ম পুনর্গঠন, আইপিও অনুমোদনের সময় ১৮ মাস থেকে কমিয়ে তিন মাসে নামিয়ে আনা, ফ্লোর প্রাইস তুলে দেওয়া, সার্কিট ব্রেকারের সংস্কার এবং বিনিয়োগকারী সুরক্ষা তহবিল থেকে অর্থ বিতরণ উল্লেখযোগ্য। ভবিষ্যতে বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণে কনভার্টিবল বন্ড, রিটস এবং কর্মীদের জন্য ইকুইটি স্টক অপশন চালুর কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে বীমা ও পেনশন খাতের অর্থ কাজে লাগানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বহুজাতিক ও বড় দেশীয় কোম্পানিকে বাজারে আনতে সরাসরি তালিকাভুক্তির সুযোগ রাখা হয়েছে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান মাসুদ খান জানান, আইপিও প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রতারণা ও অনিয়ম রোধে ডিজিটালাইজেশনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ব্রোকারদের ব্যাক অফিস সফটওয়্যার একীভূত করা, রিয়েল টাইমে নজরদারি, অ্যাপভিত্তিক অর্ডার ব্যবস্থাপনা এবং কাগজের ব্যবহার হ্রাসের কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়া পুঁজিবাজার ট্রাইব্যুনাল কার্যকর করতে আইন সংশোধন এবং ক্লিয়ারিং করপোরেশন অব বাংলাদেশকে নতুন ব্যবস্থায় সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক ও আইডিআরএ চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন উপস্থিত ছিলেন। আইপিওতে আন্তর্জাতিক পদ্ধতিতে মূল্যায়ন ও মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।

শেয়ার করুন