জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন। গত মাসে নেপালে আঘাত হানা ভয়াবহ বন্যাকে তিনি বিশ্বব্যাপী বাড়তে থাকা জলবায়ু সংকটের একটি বড় পূর্বাভাস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। উষ্ণ জলবায়ুর প্রভাব হিমালয়ের ভঙ্গুর পরিবেশকে চরম অস্থিতিশীল করে তুলেছে, যার ফলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়া এবং পারমাফ্রস্ট বিলীন হওয়ার মতো বিপর্যয় ঘটছে। এর ফলে পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন ধরে জমাট থাকা মাটি গলছে, হিমবাহ দ্রুত গলে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। গত মাসের শেষ দিকে নেপাল তার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের বিজ্ঞানীরা ঘটনাটিকে একটি ‘সম্মিলিত সংকট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, স্থানীয় ভূতাত্ত্বিক অস্থিতিশীলতার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি উষ্ণায়ন একত্রিত হয়ে হিমবাহ সরে যাওয়া ও পারমাফ্রস্ট বা দীর্ঘদিন ধরে জমাট থাকা মাটি গলার মতো প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে।
নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট সুনামির মতো প্রবল ঢলে নেপালে নজিরবিহীন ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ বিপর্যয়ে অন্তত এক হাজার ৪০০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং এখনো প্রায় ছয় হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। প্রাথমিক সরকারি হিসাবে এ দুর্ঘটনায় প্রায় ৫০০ কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির তথ্য উঠে এসেছে।
বিশ্বের গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান মাত্র দশমিক এক শতাংশের চেয়েও কম উল্লেখ করে বালেন্দ্র শাহ বলেন, এই সংকট তৈরিতে নেপালের ভূমিকা নগণ্য হলেও এর মাশুল তাদেরই দিতে হচ্ছে। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট এই ভয়াবহ বিপর্যয় একা মোকাবিলা করা নেপালের পক্ষে সম্ভব নয়। বালেন্দ্র শাহ বলেন, ‘বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে নেপালের অবদান ০ দশমিক ১ শতাংশেরও কম। আমরা এই সংকট তৈরি করিনি, অথচ এর মূল্য আমাদেরই দিতে হচ্ছে।’।
বিপর্যয় পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে নেপাল জাতিসংঘের লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড থেকে সর্বোচ্চ দুই কোটি ডলার সহায়তা চেয়েছে। যদিও ২০২২ সালে পাকিস্তানের বন্যার পর এই তহবিল গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু এখনো কোনো দেশ এখান থেকে অর্থ পাওয়ার নজির তৈরি করতে পারেনি। ফলে এই অর্থ ছাড়ের বিষয়টি নেপালের জন্য একটি বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জলবায়ু কূটনীতিকে বর্তমানে নিজের সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার ঘোষণা করে বালেন্দ্র শাহ ‘হিমালয়া ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স মেকানিজম’ নামে একটি আঞ্চলিক উদ্যোগ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। এতে ভারত ও চীনকে অন্তর্ভুক্ত করে স্যাটেলাইট তথ্য বিনিময়, হিমবাহের হ্রদ পর্যবেক্ষণ এবং যৌথ আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে নেপালকে যে বিপুল ব্যয় করতে হবে, তার একটি অংশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বহন করার আহ্বান জানান তিনি। তবে সাম্প্রতিক এই বিপর্যয়ের পর শাহের সরকারের প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে জলবায়ু কূটনীতি।
আন্তর্জাতিক মহলের সাড়া সম্পর্কে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, জি-৭ দেশগুলো অনানুষ্ঠানিকভাবে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং যুক্তরাজ্যও নেপালের পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে। এছাড়া, চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র বন্যা-পরবর্তী পুনরুদ্ধার কাজে ৩ কোটি ১০ লাখ ডলার সহায়তা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, ৩৬ বছর বয়সী সাবেক র্যাপার বালেন্দ্র শাহ ছয় মাস আগে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের ঢেউয়ে ক্ষমতায় আসেন। তবে ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর তার সরকারের মূল মনোযোগ এখন জলবায়ু কূটনীতির দিকেই নিবদ্ধ হয়েছে।





