৫ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গোয়েন্দা তৎপরতার অভাবে হাতছাড়া পাচার হওয়া ২৫ মিলিয়ন ডলার

প্রকাশ:

বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া ২৫ মিলিয়ন ডলারের একটি বড় অংশের সন্ধান পেয়েছিল যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ)। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০৭ কোটি টাকার এই বিশাল অঙ্কের হিসাবটি ছিল ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শওকত আলী চৌধুরীর ইউবিএস এজির লন্ডন শাখায়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাজ্য কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটকে (বিএফআইইউ) অবহিত করে এবং অর্থ উদ্ধারে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নিতে তাগিদ দেয়। কিন্তু বিএফআইইউ সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হওয়ায় এই অর্থ লন্ডনের ব্যাংক হিসাব থেকে কৌশলে দুবাইয়ে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

বিএফআইইউ ও বিভিন্ন সরকারি সংস্থার নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, শওকত আলীর বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগের তদন্ত চলাকালীন এই অর্থের হদিস মেলে। গত বছর জুলাই মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশে তার ব্যাংক হিসাব সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। এরপর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) তার বিরুদ্ধে পৃথক অনুসন্ধান শুরু করে। তাদের অনুসন্ধানে শওকত আলীর দেশ-বিদেশের সম্পদ, ব্যবসায়িক লেনদেন ও অর্থ পাচারের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছিল।

ফেব্রুয়ারি মাসে এনসিএ বারবার বাংলাদেশকে তাগিদ দিয়েছিল যে, অর্থটি আটকে রাখার জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অপরাধের সঙ্গে অর্থের যোগসূত্র এবং দেশে কোনো আইনি ব্যবস্থা বা সম্পদ ক্রোকের প্রমাণ উপস্থাপন করা জরুরি। ১৯শে ফেব্রুয়ারি এনসিএ-র পক্ষ থেকে জানানো হয়, যুক্তরাজ্যে অর্থ আটকে রাখার প্রাথমিক মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা প্রয়োজন। তবে বিএফআইইউ তখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান আইনি ভিত্তি উপস্থাপন করতে পারেনি।

২২শে ফেব্রুয়ারি বিএফআইইউ-এর দেওয়া জবাবে শওকত আলীকে ‘পারসন অব ইন্টারেস্ট’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো মামলার অভিযোগপত্র বা সম্পদ ক্রোকের আইনি নথি ছিল না। ২৫শে ফেব্রুয়ারি সংস্থাটি আরও কিছু তথ্য পাঠায়, যেখানে এনবিআর, সিআইডি ও দুদকের আলাদা অনুসন্ধানের কথা বলা হয়। তবে এসব অনুসন্ধান তখনও প্রাথমিক পর্যায়ে থাকায় বিদেশের ২৫ মিলিয়ন ডলারের সঙ্গে কোনো সরাসরি অপরাধের যোগসূত্র তখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

এনসিএ-র আন্তর্জাতিক দুর্নীতি দমন সমন্বয় কেন্দ্র ২৭শে ফেব্রুয়ারি এক বার্তায় জানায়, সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি ও প্রমাণের অভাবে তারা আর কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এছাড়া ২৩শে ফেব্রুয়ারি এনসিএ কর্মকর্তা ইয়ান পোর্টার জানান, বাংলাদেশি তদন্ত সংস্থাগুলোর সঙ্গে তথ্য ভাগাভাগির জন্য প্রয়োজনীয় অপারেশনাল ব্যবস্থা বা ওএসজেএ তখনও অনুমোদিত ছিল না।

আইনি ভিত্তি তৈরির ক্ষেত্রে বিএফআইইউ-এর কৌশলটি ছিল দুর্বল। সংস্থাটি শওকত আলীর বিদেশে অর্থ পাঠানোর পেছনে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন না থাকার যুক্তি উপস্থাপন করে। কিন্তু যুক্তরাজ্যে ১৯৭৯ সালের বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন বাতিল হয়ে যাওয়ায় ওই যুক্তিটি কার্যকর কোনো আইনি বাধা হিসেবে কাজ করেনি। এর ফলে লন্ডনে চার সপ্তাহ আটকে থাকার পর আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে অর্থটি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় যুক্তরাজ্য কর্তৃপক্ষ।

শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে, যার বার্ষিক গড় প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার। এমন পরিস্থিতিতে পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে দুর্বল তদন্ত ও মামলা পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল কমিটি। সরকার এখন বিদেশে সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আইনি সহায়তার প্রক্রিয়া জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু নির্ধারিত সময়ে তথ্য পাঠাতে না পারায় জব্দ অর্থ হাতছাড়া হয়েছে বাংলাদেশের। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: হাতে আসা নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীনে পরিচালিত দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপের ঘাটতিতেই বিপুল এই অর্থ উদ্ধারের সুযোগটি হাতছাড়া হয়েছে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: সংস্থাটির সঙ্গে এনসিএ’র পক্ষ থেকে দফায় দফায় যোগাযোগ করা হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আর সেই সুযোগেই বিপুল পরিমাণ অর্থ লন্ডন থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতে সরিয়ে নেয়ার সুযোগ পান শওকত। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: একই সঙ্গে ওই অর্থের সঙ্গে বাংলাদেশে চলমান অপরাধের যোগসূত্র কী, তাও জানতে চাওয়া হয়। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: অর্থাৎ বিদেশে থাকা ২৫ মিলিয়ন ডলারের সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার মতো তথ্য বিএফআইইউ’র জবাবে উঠে আসেনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এনবিআর’র তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন যৌথ কর কমিশনার মোহাম্মদ দাউদ হোসেন, সিআইডি’র পরিদর্শক গোলাম সরোয়ার এবং দুদকের উপ-পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান।

শেয়ার করুন