আগামী ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আন্তালিয়ায় বসছে জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন, যাকে বলা হচ্ছে ‘কপ ৩১’। এই সময়টি বাংলাদেশের জন্য এক বিরল সন্ধিক্ষণ। একদিকে জলবায়ু সংকটের বাস্তব মোকাবিলা, অন্যদিকে একই মাসে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণের প্রস্তাবনা। এতদিন বাংলাদেশ এলডিসি পরিচয়ের সুবাদে জলবায়ু অর্থায়ন, বিশেষ বাণিজ্যিক সুবিধা ও কারিগরি সহায়তার বড় অংশ পেয়ে এসেছে। এখন সেই অগ্রাধিকারের দরজাগুলো সংকীর্ণ হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। এবারের সম্মেলনটি আয়োজকদের ভাষায় ‘বাস্তবায়নের সম্মেলন’।
অর্থায়নের মাপকাঠি হোক ঝুঁকি
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবিটি হলো—জলবায়ু অর্থায়নের মাপকাঠি হতে হবে মাথাপিছু আয় নয়, বরং ভৌগোলিক ঝুঁকি। বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকির সূচকে বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের সপ্তম অবস্থানে রয়েছে। উত্তরণ যেন আমাদের জন্য শাস্তিতে পরিণত না হয়, সেজন্য বিশেষ সহায়তার সুযোগ প্রয়োজন। আমাদের দাবি হওয়া উচিত, উত্তরণ-পরবর্তী অন্তত পাঁচ থেকে সাত বছর যেন আগের মতোই সহজ শর্তে জলবায়ু অর্থায়ন অব্যাহত থাকে। এছাড়া গত দুই সম্মেলনে ঘোষিত বছরে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থায়ন লক্ষ্য কিংবা ২০৩৫ সালের মধ্যে বছরে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের অঙ্গীকারগুলো বড় মনে হলেও, এর বড় অংশ যদি ঋণের মোড়কে আসে, তবে তা বাংলাদেশের ঋণের বোঝাই বাড়াবে। অথচ বাংলাদেশ এই সংকটের জন্য কার্যত দায়ী নয়।
অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা
- বাংলাদেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৫০ সাল পর্যন্ত প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন, যার বছরে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার বাইরের উৎস থেকে আসা জরুরি।
- অভিযোজন অর্থায়ন তিন গুণ করার সময়সীমা ২০৩০ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। যাদের ঘরে আজ পানি উঠছে, তাদের জন্য এই পাঁচ বছরের বিলম্ব বিলাসিতা।
- ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার আন্তর্জাতিক তহবিল গঠিত হলেও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছায়নি। বাংলাদেশের দাবি—এই তহবিলকে সরাসরি জাতীয় পর্যায়ে ব্যবহারযোগ্য ও দ্রুত ছাড়যোগ্য করতে হবে।
- উপকূলীয় বাঁধ, লবণসহিষ্ণু ফসল, সুপেয় পানির সংস্থান ও জলবায়ু-অভিবাসীদের পুনর্বাসন—এগুলোই অভিযোজনের মূল লড়াই। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে সক্রিয় কণ্ঠস্বর হতে হবে।
বাণিজ্য ও কার্বনের নতুন লড়াই
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন সীমান্ত কর ব্যবস্থা ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। বর্তমানে সিমেন্ট, সার, ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর এটি প্রযোজ্য হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে তৈরি পোশাকসহ প্রায় সব পণ্য এর আওতায় আসতে পারে। হিসাব বলছে, পোশাক শিল্পে এই করের প্রভাবে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ বাড়তি বোঝা তৈরি হতে পারে। উত্তরণের পর শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর ধাক্কা মিলিয়ে মোট বোঝা ১৭ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। বাংলাদেশের অবস্থান পরিষ্কার হওয়া উচিত—কার্বন কমানোর নামে যেন উন্নয়নশীল দেশের সামনে নতুন বাণিজ্যপ্রাচীর তৈরি না হয়। আমরা শিল্পের সবুজ রূপান্তরে আগ্রহী, কিন্তু এর জন্য প্রযুক্তি, অর্থ ও যুক্তিসংগত সময় প্রয়োজন। একই সঙ্গে কার্বন ক্রেডিট বাণিজ্য নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে, যাতে উপকূলীয় বনভূমি বিদেশি কোম্পানির সস্তা ‘অফসেটে’ পরিণত না হয়।
বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রস্তুতির মঞ্চ
সরকার সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে জলবায়ু অর্থায়ন–সংক্রান্ত একটি জাতীয় কমিটি গঠন করেছে, যার ওপর কার্বন বাণিজ্য ও প্যারিস চুক্তির ষষ্ঠ অনুচ্ছেদ বাস্তবায়নের ভার রয়েছে। আমাদের নতুন জলবায়ু অঙ্গীকারে ২০৩৫ সালের মধ্যে বিদ্যুতের ২৫ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আনার লক্ষ্য রাখা হয়েছে, যা বর্তমানে ৫ শতাংশেরও নিচে। এই লক্ষ্য পূরণের বড় অংশই আন্তর্জাতিক সহায়তা-নির্ভর। তাই কপ ৩১ শুধু চাওয়ার মঞ্চ নয়, নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণেরও জায়গা। আন্তালিয়ায় আমাদের কেবল অভিযোগের ঝুড়ি নয়, বরং সৌরবিদ্যুৎ, শিল্পের ছাদে সৌর প্যানেল, সঞ্চালন গ্রিডের আধুনিকায়ন ও সবুজ শিল্পায়নের বিনিয়োগযোগ্য সুনির্দিষ্ট প্রকল্পের তালিকা নিয়ে যেতে হবে। স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উত্তরণ ঘটলেও জলবায়ুবিপন্ন দেশগুলোর মঞ্চে আমাদের অভিজ্ঞতা ও নৈতিক পুঁজি আমাদের অবস্থানের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করবে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এবারের সম্মেলনের আয়োজক তুরস্ক, দর-কষাকষির নেতৃত্বে অস্ট্রেলিয়া, আর প্রাক্-সম্মেলন বসছে প্রশান্ত মহাসাগরের দুই দ্বীপরাষ্ট্র ফিজি ও টুভালুতে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আয়োজকেরা একে বলছেন ‘বাস্তবায়নের সম্মেলন’, অর্থাৎ নতুন প্রতিশ্রুতি নয়, পুরোনো অঙ্গীকার মাঠে নামানোর পালা। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: এত দিন বাংলাদেশ জলবায়ু অর্থায়ন, বিশেষ বাণিজ্যসুবিধা ও কারিগরি সহায়তার অনেকটা পেয়ে এসেছে স্বল্পোন্নত দেশের পরিচয়ের সূত্রে। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: মাথাপিছু আয় খানিকটা বাড়ল বলে একটি বদ্বীপের বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা কিংবা নদীভাঙনের ঝুঁকি একবিন্দুও কমেনি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: জীবাশ্ম জ্বালানি ছাড়াই কপ৩০ চুক্তি: শক্তি রূপান্তর কি তাহলে থমকে গেল। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: আমাদের আলোচনায় জলবায়ু অর্থায়নকে প্রায়ই কেবল অঙ্কের হিসাবে দেখা হয়, কত বিলিয়ন এল সেটিই যেন সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি। প্রতিবেদনে যোগ করা তথ্য: কিন্তু আমার কাছে প্রশ্নটি ভিন্ন: অর্থ কোন চরিত্রে আসছে, অনুদান নাকি ঋণ।





