সরকারের দায়িত্ব শুধু সঙ্কটের কারণ ব্যাখ্যা করা নয়; কত দিনের মধ্যে কত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়বে, আমদানিনির্ভরতা কতটা কমবে এবং কার ওপর বাস্তবায়নের দায় থাকবে— তা স্পষ্ট করা। বিরোধী দলের দায়িত্ব শুধু প্রতিবাদ নয়; তথ্যভিত্তিক সমালোচনা, কার্যকর বিকল্প এবং জনস্বার্থে সহযোগিতা দেয়া। সম্প্রীতি মানে নীরবতা নয়, সহযোগিতা মানে আত্মসমর্পণ নয় এবং বিরোধিতা মানে শত্রুতা নয়। রাজনৈতিক কটাক্ষ দিয়ে সঙ্কটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন সত্য স্বীকার, সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা, প্রকাশ্য জবাবদিহি এবং সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক গণতান্ত্রিক সম্মান।
জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, লংমার্চ করে গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করা গেলে সরকার সবার আগে তার আয়োজন করত। তিনি বর্তমান সঙ্কটের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের দুর্ঘটনাকে দায়ী করেছেন। তবে এই ঘটনাগুলো সঙ্কট তীব্র হওয়ার তাৎক্ষণিক কারণ মাত্র। সরকার গঠনের ১০ থেকে ১২ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় কাতার থেকে চুক্তিভিত্তিক এলএনজি সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যায়। এছাড়া মহেশখালীর একটি এফএসআরইউতে অগ্নিকাণ্ডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, যার মধ্যে একটি ইউনিট আংশিক চালুর মাধ্যমে ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে চূড়ান্ত তদন্তের আগে শর্ট সার্কিটকে একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানের ব্যর্থতা ও আমদানিনির্ভরতার কথা উঠে এলেও, সঙ্কটের পূর্ণ ব্যাখ্যা সেখানে অনুপস্থিত। দুর্ঘটনার আগেই দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ঘাটতি ছিল। জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য দৈনিক অন্তত তিন হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং পূর্ণ ঘাটতি দূর করতে তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। অথচ দেশীয় উৎপাদন এক হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসায় সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে মাত্র দুই হাজার ৬০০ থেকে দুই হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ, যুদ্ধ বা দুর্ঘটনা না ঘটলেও দেশে গুরুতর গ্যাস-ঘাটতি থাকত।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য ঘোষণা করেছে, যা ইতিবাচক। তবে জমি, সঞ্চালনব্যবস্থা, ব্যাটারি সংরক্ষণক্ষমতা ও অর্থায়নের সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এখনো অস্পষ্ট। এছাড়া ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি এফএসআরইউ স্থাপনের পরিকল্পনা অর্থনৈতিক পরীক্ষার দাবি রাখে, কারণ ডলারের সীমাবদ্ধতায় এলএনজি কেনা না গেলে এগুলো বোঝায় পরিণত হতে পারে। সরকারের উচিত অবিলম্বে ৯০ দিনের জরুরি পরিকল্পনা প্রকাশ করা, যেখানে উৎপাদন ও সরবরাহের প্রকৃত তথ্য থাকবে। পাশাপাশি এফএসআরইউ দুর্ঘটনার স্বাধীন তদন্ত, দেশীয় কূপ খনন ও পুরনো কূপ সংস্কারে গুরুত্ব দিতে হবে।
বিরোধী দল সরকারের অংশ নয়, বরং গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের কর্মসূচিকে কটাক্ষ করলেও, লংমার্চের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচির উদ্দেশ্য জনদুর্ভোগ দৃশ্যমান করা ও সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা। বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান জনকল্যাণমূলক কাজে সহযোগিতার আশ্বাস দিলেও, তা নিঃশর্ত নয়। সরকার জনগণের স্বার্থে কাজ করলে বিরোধী দল সহযোগিতা করবে, কিন্তু রাষ্ট্র ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থে পরিচালিত হলে তার বিরোধিতা করা বিরোধী দলের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সরকারের উচিত বিরোধী দলের প্রশ্ন ও সংসদীয় তদারকিকে গণতন্ত্রের বৈধ অংশ হিসেবে সম্মান করা।





