ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে চলমান টানাপড়েনের মধ্যে নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশের পরবর্তী হাইকমিশনার হিসেবে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়ামকে নিয়োগের বিষয়টি নতুন জটিলতা সৃষ্টি করেছে। অনলাইন এনডিটিভি জানিয়েছে, এক মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ভারত এখনও ঢাকার মনোনীত এই প্রার্থীকে অনুমোদন দেয়নি, যা দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বাংলাদেশ তার পেশাদার কূটনীতিক আসাদ আলম সিয়ামকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে হাইকমিশনার হিসেবে পাঠাতে আগ্রহী। তবে এই নিয়োগ কার্যকর করার জন্য স্বাগতিক দেশ ভারতের আনুষ্ঠানিক সম্মতি বা ‘অ্যাগ্রিমো’ প্রয়োজন। গত বছর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব নেওয়া সিয়াম এর আগে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। ভারতের অনুমোদন ছাড়া নয়াদিল্লিতে তার নতুন দায়িত্ব গ্রহণ আনুষ্ঠানিকভাবে সম্ভব নয়।
এই মুহূর্তে হাইকমিশনার নিয়োগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের বর্তমান হাইকমিশনার এম. রিয়াজ হামিদুল্লাহর মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। আগামী অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে তার জেনেভায় যাওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নতুন দায়িত্ব নেবেন। ফলে নয়াদিল্লিতে তার শূন্যস্থানে দ্রুতই একজন নতুন হাইকমিশনার নিয়োগ করা জরুরি।
কূটনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো দেশ তার পছন্দের রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনারকে অন্য দেশে সরাসরি নিয়োগ দিতে পারে না; যে দেশে তাকে পাঠানো হবে, সেই দেশের অনুমোদন আবশ্যক। তবে স্বাগতিক দেশ কোনো প্রার্থীকে অনুমোদন না দিলে তার কারণ জানানো বাধ্যতামূলক নয়, এমনকি এ বিষয়ে নীরব থাকারও সুযোগ রয়েছে। সাধারণত, ব্যক্তিগত কূটনৈতিক জটিলতা প্রকাশ্যে এনে দুই দেশের মধ্যে নতুন বিরোধ এড়াতে বেশিরভাগ দেশই নীরবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে থাকে।
সুতরাং, কারও নিয়োগের অনুমোদন না দেওয়া মানেই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করা নয়। তবে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে চলমান অন্যান্য ঘটনাপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে নয়াদিল্লির এই নীরবতা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন মোড় পরিবর্তনের যে আশা তৈরি হয়েছিল, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তা দ্রুতই ম্লান হয়ে গেছে।
উদাহরণস্বরূপ, আগস্টে তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফরের কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল হয়ে যায়। এছাড়াও, বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক জোট বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস নেতাদের সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য ভারত তাকে আমন্ত্রণ জানালেও তিনি সেই সম্মেলনে যোগ দেননি। এমনকি বাংলাদেশ থেকেও কাউকে পাঠানো হয়নি এবং দিল্লিতে বাংলাদেশের দায়িত্বপ্রাপ্ত বর্তমান হাইকমিশনার হামিদুল্লাহও ওই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন না। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে নতুন করে তৈরি হওয়া উত্তেজনা।
তবে, দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি স্থবির হয়ে যায়নি। শীর্ষ রাজনৈতিক পর্যায়ে টানাপড়েন থাকলেও নিচের স্তরে সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। গত সপ্তাহেই দুই দেশের কর্মকর্তারা ঢাকায় রেল যোগাযোগ নিয়ে দুই দিনব্যাপী বৈঠক করেছেন, বিশেষ করে সীমান্তপারের ট্রেন চলাচলের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। গত সাত মাসের মতো সময়ে দুই দেশের বেশ কয়েকটি কারিগরি ওয়ার্কিং গ্রুপও আবার সক্রিয় হয়েছে এবং কাজ শুরু করেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, রাজনৈতিক পর্যায়ে যা-ই ঘটুক না কেন, দুই সরকারই দৈনন্দিন সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সচল রাখতে আগ্রহী।
চলতি বছরের শুরুতে ভারত সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় তাদের হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। জুনের শেষ দিকে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তার পদমর্যাদা মন্ত্রিসভার সমমর্যাদার করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে এটি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ভারত কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তার একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি ঘটেছিল। এরপর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের দিকে আরও বেশি ঝুঁকে পড়ে, যা নয়াদিল্লিতে ভালোভাবে নেওয়া হয়নি। তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পর সম্পর্ক নতুন করে স্বাভাবিক করার বিষয়ে আশাবাদ তৈরি হলেও, পুরোনো উত্তেজনা ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এখনও দুই দেশের সম্পর্ককে স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে নেওয়ার পথে বাধা হয়ে আছে।
গত এক মাসেই ভারত তারেক রহমানকে দুটি পৃথক আমন্ত্রণ জানিয়েছিল – একটি রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য এবং অন্যটি ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য। কিন্তু কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। এর মধ্যে বাংলাদেশের মনোনীত পরবর্তী হাইকমিশনার আসাদ আলম সিয়ামের নিয়োগে ভারতের অনুমোদন ঝুলে থাকায় দুই দেশের সম্পর্কের জটিলতায় আরও একটি নতুন প্রশ্ন যুক্ত হলো। দুই দেশ এখনও কারিগরি বৈঠক ও বিভিন্ন ওয়ার্কিং গ্রুপের মাধ্যমে যোগাযোগ অব্যাহত রাখলেও, নয়াদিল্লি বাংলাদেশের মনোনীত শীর্ষ কূটনৈতিক প্রতিনিধিকে এখনও অনুমোদন না দেওয়ার বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান দূরত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।





