লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে ইয়েমেন ও জিবুতির মধ্যবর্তী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সরু জলপথ বাব আল-মানদেব প্রণালি এখন ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। এই জলপথটি মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহনের অন্যতম বিকল্প পথ হিসেবে পরিচিত। কয়েক সপ্তাহ ধরে হুতিরা এই এলাকা দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলার হুমকি দিয়ে আসছিল, যা তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে চলমান উত্তেজনার একটি নতুন ফ্রন্ট হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এএফপির সংবাদ অনুযায়ী, হুতিরা বন্দরনগর মোখা দখল করেছে এবং ইয়েমেন সরকারের কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী, নৌপথটির মাঝখানে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপও তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদন বলছে, হুতি বাহিনী সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব তাদের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। মূলত ইরাক থেকে ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার পর সৌদি কর্তৃপক্ষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বাব আল-মানদেব দীর্ঘকাল ধরে বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রাণভোমরা হিসেবে বিবেচিত। হরমুজ প্রণালি কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ায় এই জলপথের গুরুত্ব আরও বহুগুণ বেড়েছিল। এনার্জি অ্যাসপেক্টসের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিচার্ড ব্রোঞ্জের মতে, এই পথ হারানোর বিষয়টি পরিস্থিতির চরম অস্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হতো, যার একটি বড় অংশ পরবর্তীতে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে রপ্তানি শুরু হয়। ব্রোঞ্জের হিসাবে, একপর্যায়ে ইয়ানবু বন্দর দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল বাব আল-মানদেব দিয়ে যেত। তবে হুতিদের হুমকির কারণে আগস্টে এই পথে সৌদি তেল পরিবহন প্রতিদিন প্রায় ৪ লাখ ব্যারেলে নেমে আসে এবং বর্তমানে তা আরও কমেছে।
এখন জাহাজগুলোকে বাব আল-মানদেব এড়িয়ে সুয়েজ খাল পেরিয়ে ভূমধ্যসাগরে যেতে হচ্ছে। এরপর আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল ধরে দক্ষিণে গিয়ে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এশিয়ায় পৌঁছাতে হচ্ছে। এই পথে গেলে যাত্রার সময় প্রায় এক মাস পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে, যা জাহাজভাড়া ও মূল্যস্ফীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রিচার্ড ব্রোঞ্জ জানান, এশিয়ার অনেক শোধনাগার বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করায় তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে।
তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৭ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল, যা মে মাসের পর সর্বোচ্চ। পরে তা ১০৪ ডলারে নেমে আসে। বাজার গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কেপলারের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল বিশ্লেষক জোহানেস রাউবাল জানান, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়া, সৌদি আরবের উৎপাদন হ্রাস এবং রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলার কারণে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে। তিনি সতর্ক করেছেন যে, এই পরিস্থিতির দ্রুত সমাধানের লক্ষণ নেই।
জ্বালানির দাম বাড়লে সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়ে গ্যালনপ্রতি ৬ ডলার ছাড়িয়েছে। বাংলাদেশেও আগস্ট মাসে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে ছিল, এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে দেশে মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জেনেটার প্রধান বিশ্লেষক পিটার স্যান্ডের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত বাড়ার সাথে সাথে বাব আল-মানদেব দিয়ে জাহাজ চলাচল ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কমেছে এবং সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তা আরও ৪৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। যদিও জাহাজ চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কম, তবুও এই পথে চলাচলকারী প্রতিটি জাহাজ এখন সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।





