চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য: অস্ত্র ও মাদকের ভয়ংকর থাবা

প্রকাশ:

চট্টগ্রাম নগরীতে বর্তমানে প্রায় ২০০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে, যাদের নাম শুনলে সিনেমার ভিলেন গ্রুপের কথা মনে পড়ে। ‘ডেঞ্জার’, ‘ফোর জিরো সেভেন’, ‘পাইথন’, ‘বিগু’, ‘এমবিএস’, ‘কেবি’, ‘এনএস’ ও ‘ট্রিপল নাইন’-এর মতো এসব গ্যাংয়ের সদস্যদের বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। রাত নামলেই তারা দেশীয় অস্ত্র ও মাদকের পসরা সাজিয়ে ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নেমে পড়ে। স্কুলছাত্র থেকে প্রধান শিক্ষক—কেউই তাদের টার্গেট থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, এসব কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে অর্ধশতাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’ প্রশ্রয়দাতা হিসেবে কাজ করছেন। তবে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে বেশ কিছু সাফল্যও এসেছে। সম্প্রতি নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ‘ডেঞ্জার গ্রুপ’সহ বেশ কয়েকটি গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলমের তত্ত্বাবধানে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আজিজের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে কিশোর গ্যাং পরিচালক ডেভিড ইমন ও ‘গলাকাটা’ মোবারককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশের ভাষ্যমতে, এই দুইজনের গ্রেপ্তারে নগরীর কয়েকটি গ্যাংয়ের নেটওয়ার্কে বড় ধাক্কা লেগেছে। এছাড়া রাউজানকেন্দ্রিক সন্ত্রাসী রায়হানকে ধরতেও অভিযান চলছে।

কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য এখন স্কুল-কলেজ প্রাঙ্গণেও পৌঁছেছে। লোহাগাড়ার ইকরা আবদুল জব্বার উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র আবদুল্লাহ হোসাইনকে গত শনিবার দুপুর দেড়টায় স্কুল থেকে অপহরণের চেষ্টা করে একই স্কুলের শিক্ষার্থী আরিয়ান মো. আয়ান ও তার ৪-৫ সহযোগী। স্থানীয়দের সহায়তায় অপহরণ চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এই ঘটনার জেরে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. জামাল উদ্দিন ভূঁইয়াকে ‘ডেভিড জিহাদ’ পরিচয় দিয়ে গুম ও খুনের হুমকি দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি লোহাগাড়া থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাংগুলোর সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে। গত ১২ই এপ্রিল চকবাজার থানার ডিসি রোড এলাকায় মোবাইল ফোন ছিনতাইকে কেন্দ্র করে দুই গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বে কলেজছাত্র আশফাক কবির সাজিদকে মারধরের পর নির্মাণাধীন ভবনের লিফটের ভেতরে ফেলে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এছাড়া গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি পাহাড়তলীতে পূর্ববিরোধের জেরে আকাশ দাশ নামে এক ব্যক্তিকে ১০-১৫ জন কিশোর মিলে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে। এ ঘটনায় র‌্যাব দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

মুরাদপুর, চকবাজার, জামালখান, গণি বেকারি, হালিশহর, পাঁচলাইশ ও বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় গ্যাংগুলোর মূল দৌরাত্ম্য লক্ষ্য করা যায়। কিছু গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যা ৩০ থেকে ১৫০ জন পর্যন্ত। জামালখানে ‘ডেঞ্জার গ্রুপ’ প্রকাশ্যে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়েছে। কোতোয়ালি থানার ওসি আবু জায়েদ মোহাম্মদ নাজমুন নূর জানান, আগে আড়ালে থাকলেও এখন তারা প্রকাশ্যে এসে ভয় দেখিয়ে চাঁদা তুলছে। এছাড়া বাকলিয়ার মিয়াখান নগরে গত ৪ঠা এপ্রিল আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গোলাগুলির ঘটনায় ১৯-২০ বছর বয়সী চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পাঁচলাইশের হামজারবাগ-মোহাম্মদপুরে সক্রিয় ‘মোহাম্মদপুর বয়েজ সিন্ডিকেট-এমবিএস’ গত বছরের সেপ্টেম্বরে ৯ সদস্য গ্রেপ্তারের পর ফের সংগঠিত হচ্ছে। সিএমপি’র তথ্য অনুযায়ী, স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, কদমতলী, সিআরবি, খুলশি, ফয়’স লেক, চান্দগাঁও, আগ্রাবাদ, বন্দর ও পতেঙ্গায় সন্ধ্যার পর ছিনতাই ও মাদক কারবার বেড়ে যায়। গত ১লা মার্চ ইয়াবাসহ ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যার মধ্যে ৯ জন কিশোর গ্যাং সদস্য। ২৮শে ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম ও ফেনীতে র‌্যাব ৬টি গ্যাংয়ের ২৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। এছাড়া শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অনুসারী লিডার ইমতিয়াজ সুলতান ইকরামকেও গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পরিবার ও স্কুলের নজরদারির অভাব, মাদক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব কিশোরদের অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সংশোধন কেন্দ্রগুলোও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানিয়েছেন, ছিনতাই, মাদক ও গ্যাং দমনে পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে।

পাঁচলাইশের হামজারবাগ-মোহাম্মদপুরে সক্রিয় ‘মোহাম্মদপুর বয়েজ সিন্ডিকেট-এমবিএস’। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ১৬-১৭ বছর বয়সী ৯ সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর কিছুদিন চুপ থাকলেও তারা আবার সংগঠিত হচ্ছে। সিএমপি’র তথ্যমতে, স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, কদমতলী, সিআরবি, খুলশি, ফয়’স লেক, চান্দগাঁও, আগ্রাবাদ, বন্দর ও পতেঙ্গায় সন্ধ্যার পর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বাড়ে। মোটরসাইকেল, সাইকেল আর পথচারীদের সর্বস্ব ছিনতাই করছে। পাশাপাশি চালাচ্ছে মাদক বিক্রি। গত ১লা মার্চ নগরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইয়াবাসহ ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের মধ্যে ৯ জন কিশোর গ্যাং সদস্য। ২৮শে ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম ও ফেনীতে অভিযান চালিয়ে ৬টি গ্যাংয়ের ২৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব।সম্প্রতি র‌্যাব গ্রেপ্তার করেছে কিশোর গ্যাং লিডার ইমতিয়াজ সুলতান ইকরামকে। সে শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অনুসারী।

শেয়ার করুন