গণতন্ত্র ও জনগণের দায়বদ্ধতায় বিএনপি সবসময় আপসহীন: মাহ্দী আমিন

প্রকাশ:

সময় ও প্রজন্ম বদলালেও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং গণতন্ত্রের প্রশ্নে বিএনপি আপসহীন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। সোমবার দুপুরে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত ‘জিয়া স্মৃতি বইমেলা ২০২৬’ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। জিয়া স্মৃতি পাঠাগার ও জাতীয়তাবাদী প্রকাশনা সংস্থা এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

মাহ্দী আমিন ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ, সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীন সংগ্রাম এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আধুনিক রাষ্ট্রদর্শনকে ধারণ করে মেধাভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হবে। তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ছাত্রদলের মতো দেশপ্রেমিক ছাত্র সংগঠন পাশে থাকলে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে কোনো অপশক্তি রুখতে পারবে না।

বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি জাতীয় সংকটে বিএনপি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যতবারই বাংলাদেশে গণতন্ত্র বিপন্ন হয়েছে, ততবার বিএনপিই তা পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছে। শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যেমন বাকশাল-পরবর্তী বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছিলেন, তেমনি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেছিলেন। আর দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের পর সবার প্রাণপ্রিয় নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আবারও আজ আমরা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশকে সুসংহত করছি।

বাক্‌স্বাধীনতার ইতিহাস এবং আধুনিক রাষ্ট্র সংস্কারে বিএনপির ভূমিকা অনন্য বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান মাত্র চারটি রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্রের জায়গায় বন্ধ থাকা সব গণমাধ্যম উন্মুক্ত করে দিয়ে এ দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে এনেছিলেন। এরপর দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে উন্মুক্ত মিডিয়া ও আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সুফল পেতে শুরু করে দেশ। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার এমন একটি পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে, যেখানে মৌলিক অধিকার, আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পুরোপুরি নিশ্চিত থাকবে। তবে বাকস্বাধীনতার আড়ালে যারা চরম অশালীনতা ও মিথ্যাচার চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন তার নিজস্ব গতিতে কঠোর ব্যবস্থা নেবে বলে তিনি সতর্ক করেন।

বিএনপির পররাষ্ট্রনীতির কথা উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে সবসময় নতজানু পররাষ্ট্রনীতির বৃত্ত ভেঙে স্বাধীন ও সার্বভৌম অবস্থান বজায় রাখে। শহিদ জিয়া এবং বেগম খালেদা জিয়া সার্ক প্রতিষ্ঠা ও ওআইসিতে বলিষ্ঠ নেতৃত্বের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজের পতাকার মর্যাদা উঁচু করেছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে সেই আত্মমর্যাদাশীল ধারা আবারও ফিরে এসেছে; মালয়েশিয়া কিংবা চীনের মতো পরাশক্তিগুলোতে তার বীরোচিত সংবর্ধনা তারই প্রমাণ।

রাষ্ট্র সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপিই আধুনিক সংস্কারের মূল রূপকার। শহীদ জিয়ার ১৯ দফা থেকে শুরু করে দেশনেত্রীর ‘ভিশন ২০৩০’ এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐতিহাসিক ২৭ ও ৩১ দফার আলোকেই আজকের সমৃদ্ধ ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশের পথরেখা রচিত হয়েছে। তিনি বলেন, শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বিএনপি আমাদের অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয়ের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চরম মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা না দিলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পথচলা আরও প্রলম্বিত হতো। একজন বীর সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তিনি সরাসরি রণাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। সিপাহী-জনতার বিপ্লবের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বাকশালের পর তিনিই দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।

বিগত ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিএনপি সবচেয়ে বেশি আত্মত্যাগ করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। মাহ্দী আমিন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশের জন্য বিএনপির ৪২০ জনেরও বেশি নেতাকর্মী শহিদ হয়েছেন, যার মধ্যে একক সংগঠন হিসেবে কেবল ছাত্রদলেরই ১৪০ জনেরও বেশি নেতাকর্মী রয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী অনিশ্চয়তার দিনগুলোতে যখন কোনো কার্যকর প্রশাসন ছিল না, তখন তারেক রহমানের নির্দেশে বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা সারাদেশে জনগণের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন।

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, শ্রেণি, মত, পথ ও আদর্শ যা-ই হোক না কেন, সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভালোবেসে গণতান্ত্রিক আদর্শে এই দেশকে গড়ে তোলাই হলো বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি বিএনপির শ্রদ্ধার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শহিদ জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ ও সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর অবিচল আস্থার বিষয়টি সন্নিবেশিত হয়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সকল ধর্মের ধর্মীয় নেতৃবৃন্দকে যথাযথ সম্মান ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান করা হচ্ছে।

অর্থনীতি ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে বিএনপির ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, গার্মেন্টস খাত ও বিদেশে জনশক্তি রপ্তানির মূল রূপকার ছিলেন শহিদ জিয়া। খাল খনন, সবুজ বিপ্লব, গ্রাম সরকার গঠন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের মতো উদ্যোগগুলো আজ প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আধুনিক রূপ নিয়েছে। বর্তমান সরকারের ‘কৃষক কার্ড’ ও ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিএনপির গণমুখী রাজনীতিরই ধারাবাহিকতা। এছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া, আর আজ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সেগুলোকে ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতালে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়েছে।

অনুষ্ঠানে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমানের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক‌ শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, জিয়া স্মৃতি পাঠাগার‌ কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদা হাবিবা, স্বেচ্ছাসেবক দলের সহ-সম্পাদক আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল এবং জিয়া স্মৃতি পাঠাগার কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. জহির দীপ্তি।

শেয়ার করুন