ফুটবল বিশ্বকাপের শেষ বাঁশি বাজতে ৯০ মিনিটের বেশি সময় লাগে না। অতিরিক্ত সময় বা পেনাল্টি শুটআউট ধরলে বড়জোর দুই ঘণ্টা। কিন্তু এই স্বল্প সময়ের জন্য একটি দেশ অপেক্ষা করে চার বছর। ফুটবলাররা তাদের জীবনের সেরা সময়গুলো উৎসর্গ করেন, কোচরা কাটান নির্ঘুম রাত, আর কোটি কোটি সমর্থক বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে দিন গুনতে থাকেন। সবুজ ঘাসের ওপর এক বিকেল বা সন্ধ্যার লড়াইয়ে নির্ধারিত হয়ে যায় সবকিছুর ফলাফল।
বিশ্বকাপের এই আদালত বড় নির্মম। চার বছর আগে যারা ফিরেছিলেন, তাদের কেউ চোট কাটিয়ে ফিরেছেন, কেউ ফর্ম হারিয়েছেন আবার কেউ বয়সের কাছে হার মেনেছেন। তাদের জায়গায় এসেছে নতুন মুখ, যারা অতীতে গ্যালারিতে বসে স্বপ্ন দেখেছিল। এখানে খ্যাতি বা ইতিহাস নয়, বরং ওই দিনের পারফরম্যান্সই সবকিছু নির্ধারণ করে। ব্রাজিল যেমন নরওয়ের কাছে হেরে বিদায় নিয়েছে, যা ফুটবল বিশ্বকে অবাক করেছিল। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিদায় মানে কোটি ভক্তের চার বছরের অপেক্ষার সমাপ্তি।
মরক্কো তাদের পারফরম্যান্সে প্রমাণ করেছে, আফ্রিকার ফুটবলের শক্তি কোনো দুর্ঘটনা নয়। কানাডাকে হারানো কিংবা ফ্রান্সের বিপক্ষে লড়াইয়ে তাদের চোখে ছিল ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। স্পেন তরুণদের নিয়ে নতুন ফুটবল দর্শনের প্রতীক হয়ে উঠেছে, আবার বেলজিয়ামের জন্য এটি ছিল সোনালি প্রজন্মের শেষ অধ্যায়। ইংল্যান্ড প্রতিবারই প্রত্যাশার চাপ সামলায়, আর্জেন্টিনা জানে কোটি মানুষের স্বপ্নের ভার কেমন, আর সুইজারল্যান্ড তাদের শৃঙ্খলা ও ধৈর্য দিয়ে বড় দলকে বিপদে ফেলে।
বিশ্বকাপের ইতিহাস ট্র্যাজেডিতে ভরা। ১৯৫০ সালের ‘মারাকানাজো’ থেকে শুরু করে ১৯৮২ সালের ব্রাজিল, ১৯৯৪ সালের বাজ্জোর পেনাল্টি মিস, ২০০৬ সালে জিদানের বিদায়, ২০১৪ সালে ব্রাজিলের ৭-১ ব্যবধানে হার, ২০১৮ সালে জার্মানির গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়, কিংবা ২০২২ সালে সৌদি আরবের কাছে আর্জেন্টিনার হার বা মরক্কোর সেমিফাইনাল জয়—এসবই প্রমাণ করে বিশ্বকাপে অসম্ভব বলে কিছু নেই।
বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো এখানে দ্বিতীয় সুযোগ পাওয়া যায় না। ইউরো বা কোপা আমেরিকা বারবার ফিরে এলেও বিশ্বকাপের জন্য চার বছর অপেক্ষা করতে হয়। অনেক খেলোয়াড়ের জন্য সেই অপেক্ষা আর শেষ হয় না; বয়স বা চোট তাদের ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপের সুযোগ কেড়ে নেয়। সমর্থকরা জাতীয় পতাকা আর আবেগ নিয়ে গ্যালারিতে আসেন, খেলোয়াড়রা জাতীয় সংগীতের সময় কোটি মানুষের আশা নিয়ে চোখ বন্ধ করেন।
ম্যাচ শেষে কেউ আনন্দে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন, কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন। বিজয়ীরা ট্রফি তোলেন, পরাজিতরা ফিরে যান ড্রেসিংরুমে। তবে সেই নীরবতার ভেতরেই জন্ম নেয় আবার ফেরার প্রতিজ্ঞা। বিশ্বকাপ মানে কেবল ৯০ মিনিটের ফুটবল নয়; এটি চার বছরের ঘাম, ত্যাগ, বিশ্বাস ও অশ্রুর এক মহাকাব্য। শেষ পর্যন্ত সবাই ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়, আর সেই আনন্দ-বেদনার স্মৃতি বেঁচে থাকে পরবর্তী চার বছর বা তারও বেশি সময় ধরে।





