যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে গত এক মাস ধরে চলা সংঘাতের নতুন মোড় নিয়েছে। চলতি সপ্তাহে দুই পক্ষ আবারও পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়িয়ে পড়ায় পুরো অঞ্চলটি দীর্ঘমেয়াদী সামরিক অচলাবস্থায় পড়েছে। গত মঙ্গলবার মার্কিন বাহিনী ইরানে পুনরায় হামলা চালায়, যার জবাবে তেহরান জর্ডান, বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় আঘাত হানে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর ‘আরও কঠোর আঘাত’ করার হুঁশিয়ারি দিলেও তেহরান তা উপেক্ষা করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক হামলাগুলো সীমিত ছিল, যা ইঙ্গিত দেয় যে কোনো পক্ষই এখন সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়। ইসরায়েলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ইরান শাখার সাবেক প্রধান ড্যানি সিতরিনোভিচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, দুই পক্ষই বেসামরিক নাগরিক বা জ্বালানি অবকাঠামোর চেয়ে সামরিক লক্ষ্যবস্তুকে প্রাধান্য দিচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বাধা সৃষ্টি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপ উভয় পক্ষের জন্যই অসহনীয় হয়ে উঠছে।
যুদ্ধের আর্থিক প্রভাব সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের ওপর পড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুলাই পর্যন্ত এ যুদ্ধে ওয়াশিংটনের ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি ডলার। এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসন হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ দাবি করছে; মঙ্গলবারের অভিযানে ১ কোটি ৮০ লাখ ব্যারেল তেলবাহী ৪০টি বাণিজ্যিক জাহাজ পাহারা দিয়ে পার করার দাবি করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। তবে যুদ্ধের প্রভাব কমাতে কৌশলগত সংরক্ষিত তেল বাজারে ছাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুত ১৯৮৩ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৪ ডলারে, যা এক বছর আগে ছিল ৩ দশমিক ১৯ ডলার।
সামরিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুতও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের ‘থাড’ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় পাঁচ ভাগের চার ভাগই ব্যবহার করে ফেলেছে এবং ‘প্যাট্রিয়ট’ ইন্টারসেপ্টরের প্রায় অর্ধেকই শেষ হয়ে গেছে। ট্রাম্প গোলাবারুদের পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবি করলেও নির্দিষ্ট কিছু অস্ত্রের সরবরাহে ঘাটতির কথা স্বীকার করেছেন। এদিকে, ইউনিভার্সিটি অব ম্যাসাচুসেটসের জরিপ অনুযায়ী, ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতির বিপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ মার্কিন নাগরিক এবং তাঁর সামগ্রিক জনসমর্থন ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে।
ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও চরম সংকটে। ইরানিয়ান লেবার নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই পর্যন্ত বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে। ইরানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আরাশ আজিজি মনে করেন, বর্তমান শাসকগোষ্ঠী জানে যে আত্মসমর্পণ করলে সরকারের পতন ঘটতে পারে, তাই তারা পাল্টাজবাব দেওয়াকেই বেছে নিয়েছে। ট্রাম্প আলোচনার টেবিলে বসার চেয়ে অর্থনৈতিক অবরোধ ও সামরিক আধিপত্যের ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। তবে ইরান বারবার জানিয়েছে, ওয়াশিংটন জুনের সমঝোতা স্মারকের প্রতিশ্রুতিতে ফিরে এলে তারাও আলোচনায় বসতে প্রস্তুত। প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান কিরগিজস্তানে এসসিও সম্মেলনের ফাঁকে এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
পেন্টাগনপ্রধানের জন্য তৈরি একটি সাম্প্রতিক মূল্যায়নের বরাতে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, সামরিক কমান্ডাররা প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে সতর্ক করেছেন যে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান দীর্ঘায়িত করা অসম্ভব এবং এতে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের হুমকি মোকাবিলার মার্কিন সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। সিতরিনোভিচ এক্সে লিখেছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই অনিয়ন্ত্রিত সংঘাতের ঝুঁকি বোঝে, তা সত্ত্বেও তারা সংঘাত বাড়িয়ে চলেছে। তিনি মন্তব্য করেন, এই ভারসাম্য বেশি দিন বজায় রাখা সম্ভব নয়।





