বিচার বিভাগের দীর্ঘসূত্রতা ও মামলা জট নিরসনে জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন

প্রকাশ:

জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে বিচার বিভাগের জন্য একটি স্বতন্ত্র সচিবালয় গঠনের যে প্রাথমিক উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, তা বাতিল হওয়ায় দ্রুত বিচার পাওয়ার প্রত্যাশা এখন অনিশ্চিত। বর্তমানে বিচার ব্যবস্থায় স্থবিরতা কাটাতে এবং মামলার পাহাড়সম জট কমাতে আইনজীবী ও বিচারকরা অধঃস্তন আদালতে অবিলম্বে ১০ হাজার বিচারক নিয়োগের জোর সুপারিশ করেছেন। একই সঙ্গে বিচারিক আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। মামলার সংখ্যা কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রকে শক্তিশালী করা এবং হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলা দায়েরকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।

বিচার প্রলম্বিত হওয়ার মূল কারণ হিসেবে বিচারক স্বল্পতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের জনসংখ্যা ও মামলার পরিমাণ বহুগুণ বাড়লেও সেই অনুপাতে বিচারক বা বিচারিক আদালতের সংখ্যা বাড়েনি। বর্তমানে দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের বিপরীতে বিচারক রয়েছেন মাত্র একজন, যেখানে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই সংখ্যা ১৫ থেকে ২২ জন পর্যন্ত। সুপ্রিম কোর্টের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় ৪৮ লাখ, যার মধ্যে জেলা আদালতেই রয়েছে ৪০ লাখ ৭৮ হাজার মামলা। গত দেড় যুগে অধঃস্তন আদালতে মামলার পরিমাণ বেড়েছে দেড় গুণ, যা সামাল দেয়া কর্মরত বিচারকদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে দুই হাজার ২৩৭ জন বিচারক থাকলেও বিভিন্ন কারণে বিচারিক কাজে নিয়োজিত আছেন এক হাজার ৮৩৭ জন। এই জনবল দিয়ে বর্তমান মামলার জট নিরসন করতে গেলে ৭০ হাজার মামলা প্রতি বছর নিষ্পত্তি করলেও সময় লাগবে ৬৯ বছর। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে বহু নিরপরাধ মানুষ বছরের পর বছর কারাগারে কাটান, যা তাদের জীবন ও স্বপ্নকে তছনছ করে দেয়। বিচারিক দীর্ঘসূত্রতার বলি হওয়া মানুষদের আর্তনাদ বিচারালয়ের দেয়ালে বারবার প্রতিধ্বনিত হয়।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অধঃস্তন আদালতে পাঁচ হাজার বিচারক নিয়োগের সুপারিশ করা হলেও গত ১১ বছরে তার বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পুরোপুরি পৃথক করা না হলে এর কর্মক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব নয়। এছাড়া বিচারকদের ওপর মামলার অতিরিক্ত চাপ কমাতে তাদের জন্য নির্দিষ্ট মামলার সীমারেখা নির্ধারণ করা এবং মামলার বিকেন্দ্রীকরণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তুচ্ছ কারণে মামলা করার প্রবণতা রোধে জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং তদন্তের সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দেয়া প্রয়োজন। জনগণের দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে স্বাধীন বিচার বিভাগীয় সচিবালয় গঠন এবং প্রধান বিচারপতির ক্ষমতা বিস্তৃত করার বিষয়টি জাতীয় সংসদে আলোচনার দাবি রাখে।

শেয়ার করুন