বিয়ের পর শরীরের ওজন ধীরে ধীরে বাড়তে দেখা যাওয়া নিয়ে সমাজে অনেক রসিকতা প্রচলিত থাকলেও, গবেষণায় দাম্পত্য জীবনে প্রবেশের সঙ্গে বডি মাস ইনডেক্স (BMI) ও ওজন বৃদ্ধির একটি বাস্তবিক সম্পর্ক পাওয়া গেছে। ২০১২ সালের একটি পর্যালোচনায় ২০টি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, বিয়ে বা সহবাসে প্রবেশের সঙ্গে ওজন বাড়ার প্রবণতা রয়েছে। বিপরীতে, বিবাহবিচ্ছেদের পর ওজন কমার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। সাম্প্রতিক সিস্টেমেটিক রিভিউতেও দেখা গেছে, অবিবাহিতদের তুলনায় বিবাহিত বা একসঙ্গে বসবাসকারী তরুণ-তরুণীদের BMI বৃদ্ধির হার বেশি। তবে বিয়ে নিজেই মানুষকে মোটা করে না, বরং বিয়ের পর জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক সক্রিয়তায় যে পরিবর্তন আসে, তা ওজন বাড়ার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করে।
ওজন বাড়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো জীবনযাত্রার পরিবর্তন। বিয়ের আগে মানুষ সাধারণত নিজের ওজন ও শরীর নিয়ে বেশি সচেতন থাকে এবং নিয়মিত ব্যায়াম বা হাঁটাচলার রুটিন মেনে চলে। বিয়ের পর সংসার, সামাজিকতা ও পারিবারিক দায়িত্বের চাপে সেই মনোযোগ কমে যায়। দ্বিতীয় কারণ হলো সঙ্গীর খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব। যদি সঙ্গী বেশি ক্যালরিযুক্ত খাবার, ভাজাপোড়া বা মিষ্টিজাতীয় খাবার পছন্দ করেন, তবে অন্যজনের খাদ্যাভ্যাসেও তার প্রতিফলন ঘটে। এছাড়া একসঙ্গে বাইরে খেতে যাওয়া বা অবসর সময়ে খাবার গ্রহণের প্রবণতাও ওজন বাড়াতে সাহায্য করে। তৃতীয় কারণটি হলো শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাওয়া, যা বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে গবেষণায় বেশি লক্ষ্য করা গেছে।
নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা জটিল, কারণ বিয়ের পর গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মের পরবর্তী সময়ে ওজনের পরিবর্তন স্বাভাবিক। সন্তান লালন-পালন, ঘুমের ঘাটতি ও সময়ের অভাবে আগের ওজনে ফিরে আসা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তবে পুরুষের ক্ষেত্রেও বিয়ের পর ওজন বাড়ার প্রবণতা গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে। তাই নারী বা পুরুষ কাউকে আলাদাভাবে দায়ী না করে দাম্পত্য জীবনের সম্মিলিত জীবনযাত্রার পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া বেশি যৌক্তিক।
অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগের মতো অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, স্থূলতা একটি জটিল রোগ, যার সাথে আচরণ, পরিবেশ ও জেনেটিক বিষয় জড়িত। এর সমাধান কেবল কঠোর ডায়েট নয়, বরং দম্পতির একসঙ্গে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গড়ে তোলা। নিয়মিত হাঁটা, ঘরে পুষ্টিকর খাবার তৈরি করা, ভাজাপোড়া ও চিনিজাতীয় খাবার বর্জন করা এবং পর্যাপ্ত শাকসবজি ও প্রোটিন গ্রহণ ওজন নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে ১৫০ থেকে ৩০০ মিনিট মাঝারি বা ৭৫ থেকে ১৫০ মিনিট উচ্চমাত্রার শারীরিক পরিশ্রম করা উচিত। সবচেয়ে জরুরি হলো সঙ্গীর ওজন নিয়ে সমালোচনা না করে একে অপরকে সুস্থ থাকতে উৎসাহিত করা। বিয়ে জীবনের নতুন অধ্যায়, যেখানে একসঙ্গে ভালো থাকার পাশাপাশি সুস্থ থাকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।





