রাখাইন সংকট ও বাংলাদেশের কৌশল: একটি সমন্বিত ভূ-রাজনৈতিক রূপরেখা

প্রকাশ:

বাংলাদেশের শক্তি কেবল সামরিক সক্ষমতায় সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে এর ভূগোল, জনসংখ্যা, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থান, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং একটি বৃহৎ মানবিক সংকটের নৈতিক ও কূটনৈতিক বৈধতায়। এই শক্তিগুলোকে বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহার না করে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে। রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি বোঝা নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত পরীক্ষাও। এই পরীক্ষায় সাফল্য মানে কেবল রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নয়, বরং এমন একটি আঞ্চলিক কাঠামো তৈরি করা যেখানে রাখাইনের স্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গাদের অধিকার, বাংলাদেশের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে।

২০১৭ সালে রোহিঙ্গা সংকট যখন বিস্ফোরিত হয়, তখন সমস্যাটিকে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের উৎখাত এবং আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে প্রত্যাবাসন—এই সরল কাঠামোর মধ্যে দেখা সম্ভব ছিল। কিন্তু প্রায় এক দশক পর সেই কাঠামো আর কার্যকর নেই। আজকের রাখাইন একটি পরিবর্তনশীল ক্ষমতার ভূখণ্ড, যেখানে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র, সামরিক বাহিনী, আরাকান আর্মি, স্থানীয় জাতিগত রাজনীতি এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থ একে অপরের সাথে যুক্ত। ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন এখন কেবল ঢাকা-নেইপিডো সম্পর্কের বিষয় নয়, এটি রাখাইনের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামোর সাথেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

প্রথাগত রাষ্ট্রকেন্দ্রিক কূটনৈতিক ধারণার বাইরে গিয়ে বাংলাদেশকে এখন রাখাইনের বাস্তব নিয়ন্ত্রক পক্ষের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ করা মানেই রাজনৈতিক স্বীকৃতি নয়, বরং এটি একটি বাস্তবসম্মত কৌশল। প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আগামী দিনে প্রশ্নটি হবে, রাখাইনে বাস্তবে কে প্রশাসন পরিচালনা করছে, কর আদায় করছে এবং কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে তাই একটি পৃথক 'রাখাইন নীতি' প্রয়োজন, যা পুরো মিয়ানমারকে নয়, বরং এই নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ক্ষমতা, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার বিন্যাসকে কেন্দ্র করে তৈরি হবে।

চীনের ভূ-অর্থনৈতিক প্রকল্প যেমন কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর এবং চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর রাখাইনের ভূ-রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর। রাখাইনে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চীনের বিনিয়োগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, যা বাংলাদেশের জন্য একটি কূটনৈতিক লিভারেজ হতে পারে। তবে বাংলাদেশকে চীনের ভূ-রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে নিজের পররাষ্ট্রনীতির চালিকাশক্তি না বানিয়ে, বরং চীনা স্বার্থকে বাংলাদেশের স্বার্থে ব্যবহার করতে হবে। কোনো অর্থনৈতিক করিডোর যেন রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে না যায়, সেই রেডলাইন বজায় রাখা জরুরি।

একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্ত নিরাপত্তাকে রোহিঙ্গা সংকটের সাথে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে বৃহত্তর সীমান্ত-নিরাপত্তা পরিবেশের অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। অপ্রমাণিত নিরাপত্তা-আশঙ্কা নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, তাই তথ্য, প্রযুক্তি ও আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের ভিত্তিতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশকে একটি সুনির্দিষ্ট 'প্রত্যাবাসন আর্কিটেকচার' প্রস্তাব করতে হবে, যার মধ্যে যাচাই, সম্মতি, নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ এবং পুনর্নির্মাণ—এই ছয়টি স্তর থাকবে। এটি কোনো জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনের তারিখ নয়, বরং শর্তভিত্তিক একটি ৩৬ মাসের 'ডেটলাইন ফর ডিপ্লোম্যাসি' বা কূটনৈতিক রোডম্যাপ হতে পারে। এখানে প্রতিটি পর্যায়ে কী শর্ত পূরণ করতে হবে তা স্পষ্ট থাকতে হবে। যেমন— ০-৬ মাস : নিরাপত্তা ও প্রত্যাবাসন এলাকার মূল্যায়ন। ৬-১২ মাস : যাওয়া, দেখা এবং পুনর্গঠন। ১২-১৮ মাস : সীমিত পাইলট প্রকল্প। ১৮-৩০ মাস : প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিতকরণ এবং ৩০-৩৬ মাস : পূর্ণাঙ্গ প্রত্যাবাসন ও টেকসই পুনর্বাসন। পরিশেষে, কোনো একটি শক্তির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে বহু-ভেক্টর কূটনীতির মাধ্যমে চীন, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান ও জাতিসংঘের সমর্থনকে কাজে লাগিয়েই বাংলাদেশ এই সংকটের সমাধান নির্ধারণ করতে পারে।

শেয়ার করুন