১০ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শি জিনপিংকে ঈগলের ভাস্কর্য উপহার দিলেন ট্রাম্প

প্রকাশ:

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত এক জাঁকজমকপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে একটি বাল্ড ঈগলের ভাস্কর্য উপহার দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। উত্তর আমেরিকার এই পাখিটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় প্রতীক হিসেবে পরিচিত। বৃহস্পতিবার এই নৈশভোজের সময় ভিআইপি অতিথিদের উপস্থিতিতে ট্রাম্প ভাস্কর্যটি উন্মোচন করেন। তিনি জানান, ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সহায়তায় তিনি নিজেই এই উপহারের নকশা তৈরিতে অংশ নিয়েছেন। ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, এই ভাস্কর্যটি মূলত ‘আমেরিকার স্বাধীন ও ঊর্ধ্বগামী চেতনার’ প্রতিফলন। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিতে উপহার একটি স্বতন্ত্র উপস্থিতি পেয়েছে। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে থাকা এমোলুমেন্টস ধারার কথা উল্লেখ করা হয়।

কূটনৈতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণে উপহার বিনিময় একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের তিন দিনের শীর্ষ বৈঠকের মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দুই শক্তির মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ভিত মজবুত করা। এশিয়া গ্রুপের অংশীদার ড্যানিয়েল ক্রিটেনব্রিঙ্ক মনে করেন, দুই নেতার আলোচনায় অনেক কঠিন বিষয় থাকলেও ব্যক্তিগত পর্যায়ের সম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। তার মতে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো জটিল সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই ব্যক্তিগত রসায়ন আঠার মতো কাজ করে। কূটনীতিক হিসেবে এশিয়ায় ৩০ বছরের বেশি সময় কাটানো ক্রিটেনব্রিঙ্কের ভাষ্যমতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেও নেতা-পর্যায়ের কূটনীতিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

ট্রাম্পের বর্তমান প্রেসিডেন্সিকালে উপহার বিনিময় তার কাজের পদ্ধতির একটি বিশেষ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন সময়ে তিনি বিলাসবহুল জাম্বো জেট, খোদাই করা সোনার বার, হীরা ও রত্নখচিত আংটির মতো দামী উপহার পেয়েছেন। তবে এই উপহার প্রদানের বিষয়টি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং এর পেছনে দীর্ঘদিনের প্রটোকল ও সমন্বয় থাকে। নরওয়েজিয়ান ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ওলে জ্যাকব সেন্ডিংয়ের মতে, উপহার নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভুল করার অবকাশ নেই, কারণ একটি ভুল উপহার বড় কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ভেস্তে দিতে পারে। এটি এমন কোনো বিষয় নয় যা বিমানবন্দরে শেষ মুহূর্তে কেনা সম্ভব। এ বিষয়ে হোয়াইট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। পুরো বিষয়টি অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং এর সঙ্গে নিম্নস্তরে বহু সপ্তাহ ধরে আলোচনা ও সমন্বয় চলে।

মার্কিন সংবিধানে বিদেশি সরকারের পক্ষ থেকে উপহার গ্রহণের ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা রয়েছে। বর্তমানে প্রেসিডেন্ট কোনো বিদেশি উপহার গ্রহণ করলে তার সর্বোচ্চ সীমা ৫২৫ ডলার বা ৩৯৭ পাউন্ড। এর বেশি মূল্যের কোনো উপহার পেলে তা সরকারি সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয়, তবে প্রেসিডেন্ট চাইলে নিজের অর্থে তা কিনে নিতে পারেন। নির্দিষ্ট সীমার বাইরের উপহারের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। গবেষক মর্টেন স্কুমসরুড অ্যান্ডারসনের মতে, পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোর তুলনায় স্বৈরতান্ত্রিক বা উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে দামী উপহার দেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তার মতে, পশ্চিমা বিশ্বে গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধের কারণে এই ঐতিহ্য অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে গেছে।

উপহারের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০১৩ সালে ওবামা শি জিনপিংকে ক্যালিফোর্নিয়ার রেডউড কাঠের তৈরি একটি বেঞ্চ উপহার দিয়েছিলেন। আবার ২০০৯ সালে গর্ডন ব্রাউনের দেওয়া পেন হোল্ডার ও ওবামার দেওয়া ডিভিডি নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, কারণ সেই ডিভিডি যুক্তরাজ্যের প্লেয়ারে অচল ছিল। এই ধরনের কূটনৈতিক ঝুঁকি এড়াতেই সতর্ক থাকতে হয়। ২০১৩ সালে শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাকে ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয় রেডউড কাঠ দিয়ে তৈরি একটি খোদাইকৃত বেঞ্চ উপহার দিয়েছিলেন। ওই বেঞ্চে তারা দুজন সাক্ষাৎও করেছিলেন। পরে দুজন একসঙ্গে বেঞ্চটিতে বসে ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে ছবি তোলেন।

অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার সকালে শি জিনপিং ঘোষণা দিয়েছেন যে, চীনের পক্ষ থেকে আটলান্টার চিড়িয়াখানায় দুটি পান্ডা পাঠানো হবে। পিং পিং ও ফু শুয়াং নামের এই পান্ডা দুটি দুই দেশের জনগণের মধ্যে বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে কাজ করবে। এছাড়া আগামী পাঁচ বছরে এক লাখ মার্কিন শিক্ষার্থীকে চীনে পড়াশোনার সুযোগ দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতা এবং দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের বাণিজ্যযুদ্ধের যুদ্ধবিরতির আবহে ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের এই বৈঠক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সামরিক মহড়া থেকে শুরু করে উপহার বিনিময় পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপই দুই দেশের মধ্যকার স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলগত বার্তা বহন করে।

শেয়ার করুন