বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজাতে ও জনবল সংকট নিরসনে নতুন করে ১৪ হাজার সদস্য নিয়োগের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। গত বুধবার সচিবালয়ে প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে ১০ হাজার কনস্টেবল ও ৪ হাজার সরাসরি উপপরিদর্শক (এসআই) পদে যোগ দেবেন। বুধবার (২৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে প্রশাসনিক উন্নয়নসংক্রান্ত সচিব কমিটির সভায় পুলিশে নতুন জনবল নিয়োগের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।
প্রচলিত পুলিশ প্রবিধান বা পিআরবি সংশোধন করে এসআই পদে এবার শতভাগ সরাসরি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নিয়ম অনুযায়ী এতদিন এই পদের অর্ধেক সরাসরি এবং বাকি অর্ধেক বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হতো। তবে এবার চার হাজার পদই সরাসরি নিয়োগের আওতায় আনা হয়েছে, যা পুলিশের ইতিহাসে বিরল। প্রচলিত পুলিশ প্রবিধান অনুযায়ী, এসআই পদের ৫০ শতাংশ সরাসরি নিয়োগ এবং বাকি ৫০ শতাংশ বিভাগীয় পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করা হতো।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা ও বাহিনীর কার্যকারিতা বাড়াতে জরুরি ভিত্তিতে জনবল নিয়োগের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে একবারের জন্য এই বিশেষ নিয়ম কার্যকর হলেও ভবিষ্যতেও সরকার প্রয়োজনে একই কৌশল অবলম্বন করতে পারে। তবে সরকার প্রয়োজন মনে করলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, বর্তমান সরকারের বিবেচনায় পুলিশ প্রশাসনের কার্যকারিতা বাড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি নতুন নিয়োগের অন্যতম কারণ।
কনস্টেবল ও এসআই মিলিয়ে মোট ১৪ হাজার পুলিশ সদস্য নিয়োগের প্রক্রিয়া চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। যদিও আবেদনের বিস্তারিত শর্তাবলি, বয়সসীমা ও শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়গুলো এখনও প্রকাশ করা হয়নি। খুব দ্রুতই এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রচার করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও পরীক্ষার বিস্তারিত সময়সূচি এখনো জানানো হয়নি। তবে নিয়োগের আবেদন শুরুর তারিখ, বয়সসীমা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, শারীরিক যোগ্যতা ও আবেদনপদ্ধতির বিস্তারিত এখনো এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
তবে এসআই পদে বিভাগীয় পদোন্নতির সুযোগ বন্ধ করে শতভাগ সরাসরি নিয়োগের সিদ্ধান্তে বাহিনীর ভেতর অসন্তোষ দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকা পুলিশ সদস্যরা এতে বঞ্চিত হতে পারেন, যা দীর্ঘমেয়াদে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মনোবলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এ সিদ্ধান্তের ফলে বাহিনীর সদস্যদের মনোবল বা দায়িত্ব পালনে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
এসআই ও কনস্টেবল নিয়োগের পাশাপাশি সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদেও নতুন জনবল যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৫২তম বিসিএসের মাধ্যমে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ জন এএসপি নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষ এই বিসিএসের মাধ্যমেই শূন্যপদগুলো পূরণ করা হবে। নিয়োগের পর নতুন এএসপিদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের সময়কাল কিছুটা সংক্ষেপ করা হতে পারে বলেও আলোচনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, বিগত সাড়ে ১৫ বছরে কনস্টেবল, এসআই ও সার্জেন্ট পদসহ পুলিশ বাহিনীতে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার সদস্য নিয়োগ পেয়েছিল, যা পুরো বাহিনীর প্রায় অর্ধেক। বিগত সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত এই বিশাল সংখ্যক সদস্যের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও স্পর্শকাতর তথ্য ফাঁসের অভিযোগ ওঠায় বর্তমান সরকার নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা এবং যাচাই-বাছাইয়ে কড়াকড়ি আরোপের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অর্থ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র পাওয়ার পর নিয়োগের এ বিশাল কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। পুলিশ বাহিনীর ভারসাম্য বজায় রেখে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাই এখন সরকারের মূল চ্যালেঞ্জ।





