২৫ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দুই মিনিটের নোটিশে যুব উন্নয়নের নিয়োগ পরীক্ষা বাতিল

প্রকাশ:

রাজধানীর বিভিন্ন কেন্দ্রে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা শেষ মুহূর্তে বাতিল করা হয়েছে। ২৪২টি পদের বিপরীতে প্রায় তিন লাখ প্রার্থী এ পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। শনিবার সকালে পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর ওএমআর শিট বিতরণের মাত্র দুই মিনিটের মাথায় পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়। এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দেয়। সরকারি ছুটির দিন শনিবার সকাল থেকেই রাজধানীর মেট্রোরেল স্টেশনগুলোয় ছিল বাড়তি ভিড়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, আগারগাঁও, কাজীপাড়া ও শেওড়াপাড়া স্টেশনে যাত্রীদের চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো। কারওয়ান বাজার মেট্রোরেলে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। এর দুই মিনিটের মাথায় হলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা কক্ষে এসে জানান, অনিবার্য কারণে পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে। কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসা পরীক্ষার্থীদের একাংশ সড়কে বিক্ষোভ করেন। ২৪২ পদের বিপরীতে প্রায় তিন লাখ আবেদন।

পরীক্ষার্থীরা জানান, শুক্রবার রাত থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুঞ্জন এবং কিছু নমুনার ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল। বিষয়টি আগে থেকেই কর্তৃপক্ষের নজরে নেওয়া উচিত ছিল বলে দাবি করেন ভুক্তভোগীরা। তবে শেষ মুহূর্তে পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছেন দেশের দূরদূরান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীরা। যশোর থেকে আসা ফরিয়া ফেরদৌসসহ বহু শিক্ষার্থী জানান, অনেক ত্যাগ স্বীকার করে ও অর্থ খরচ করে তাঁরা ঢাকায় এসেছিলেন। পরীক্ষা না হওয়ায় তাঁদের এই আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির দায়ভার কে নেবে, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। তবে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে কি না, তা তাঁর জানা নেই।

পরীক্ষা বাতিলের পরপরই রাজধানীর ধানমন্ডি, সাতমসজিদ সড়ক, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ এবং মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় পরীক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন। দ্রুত নতুন তারিখ ঘোষণার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি তুলেছেন তাঁরা। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরীক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিন লাখ প্রার্থীর যাতায়াত ও আবাসনের যে খরচ হয়েছে, তা অনেকের পক্ষেই বহন করা কষ্টসাধ্য। এই ভোগান্তির কোনো মূল্য আছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশাসন উইংয়ের পরিচালক ডি এম আতিকুর রহমান জানিয়েছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নের সঙ্গে পরীক্ষার আসল প্রশ্নপত্রের আংশিক মিল পাওয়া গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতেই পরীক্ষা স্থগিতের কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তবে প্রশ্নপত্র কীভাবে বাইরে গেল, কাদের অবহেলা বা যোগসাজশ ছিল, তা নিয়ে কোনো স্বচ্ছ ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। সহকারী পরিচালক মাজহারুল হক জানিয়েছেন, খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে পরীক্ষার নতুন তারিখ ঘোষণা করা হবে।

সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদটি ১১তম গ্রেডের। এই পদে প্রতিটি পদের বিপরীতে প্রায় ১,২৪০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ছিল। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ বাংলাদেশের শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছেন। সরকারি চাকরির সীমিত সুযোগের বিপরীতে বিশাল প্রতিযোগিতার এই বাজারে পরীক্ষা বাতিল সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা দাবি করছেন, কর্তৃপক্ষকে কেবল পরীক্ষা বাতিল করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। বরং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে পরীক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি এবং আর্থিক ক্ষতি বিবেচনায় নিয়ে কর্তৃপক্ষকে পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর আগে প্রশ্নের নিরাপত্তা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা আয়োজক কর্তৃপক্ষের প্রধান দায়বদ্ধতা হওয়া উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উল্লেখ্য, চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে চিকিৎসক ও কর্মচারী পদে ১০৮টি পদের নিয়োগ সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিও বর্তমানে আলোচনায় রয়েছে। এ ছাড়া সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টের মতো নতুন খাতের কর্মসংস্থান নিয়েও চাকরির বাজারে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তবে আপাতত যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ নিয়ে সৃষ্ট অচলাবস্থা নিরসনে কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ঘোষণা ও কার্যকর পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে আছেন তিন লাখ চাকরিপ্রার্থী। অনেকে চাকরির প্রস্তুতির পাশাপাশি পরিবার ও পড়াশোনার দায়িত্ব সামলান।

শেয়ার করুন