১১ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জাতিসংঘে গাজায় গণহত্যার অভিযোগকে ‘শতাব্দীর সেরা মিথ্যা’ বললেন নেতানিয়াহু

প্রকাশ:

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত গণহত্যার অভিযোগকে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি এই অভিযোগকে ‘শতাব্দীর সেরা মিথ্যা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করেন যে, ইসরায়েল গণহত্যা চালায়নি, বরং তারা গণহত্যা প্রতিরোধ করার জন্য কাজ করেছে। তিনি বলেন, ‘আমি ইসরায়েলের জনগণের সাহসিকতাকে স্যালুট জানাই। আমি আমাদের বীর সেনাদের সাহসিকতাকে স্যালুট জানাই—তারা ইহুদি, মুসলিম, খ্রিস্টান, দ্রুজ। এরপর নেতানিয়াহু ইসরায়েলের যুদ্ধের “অষ্টম ফ্রন্ট”-এর প্রসঙ্গে আসেন।

বক্তব্যের এক পর্যায়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভূয়সী প্রশংসা করেন নেতানিয়াহু। তিনি জানান, ‘বর্বরদের’ বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ট্রাম্পের ‘সাহসী নেতৃত্ব’ ও অংশীদারত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তিনি আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে সভ্যতাকে রক্ষা করতে কাজ করছে এবং গাজা থেকে বন্দিদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য দুই দেশ সমন্বিতভাবে কাজ করেছে।

নেতানিয়াহু ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীকে (আইডিএফ) বিশ্বের অন্যতম নীতিবান ও নৈতিক বাহিনী বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, জাতি হিসেবে ইসরায়েলিরা সব বিভেদ ভুলে সংকটকালে একসূত্রে গেঁথে দাঁড়াতে সক্ষম। ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকির কথা উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন যে, একটি ক্ষেপণাস্ত্রও যদি জাতিসংঘ সদর দপ্তরে আঘাত হানে, তবে পুরো স্থাপনাটি ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। সংকটময় মুহূর্তে ইতিহাসের শিক্ষা, অভিন্ন মূল্যবোধ এবং সাহসের জোরে ইসরায়েলিরা একসূত্রে গেঁথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ায়।

ইসরায়েলের প্রতি আন্তর্জাতিক সমালোচনার বিষয়ে কাতার ও তুরস্ককে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন নেতানিয়াহু। তিনি কাতারকে দায়ী করে বলেন, হামাস নেতাদের আশ্রয় দেওয়া ছাড়াও তারা মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থায়ন এবং আল জাজিরার মাধ্যমে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য প্রচার করছে। তরুণ প্রজন্মকে ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্ববিদ্বেষী করে গড়ে তোলার পেছনেও কাতারের ভূমিকা রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। গত বছর মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া একটি চুক্তির মাধ্যমে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হাতে বন্দি থাকা জীবিত ও মৃত সকল বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়। তার মতে, ‘ইসরায়েল হলো “একই ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করা একটি জাতি—তা সে বামপন্থী বা ডানপন্থী, তরুণ বা প্রবীণ, ধর্মীয় কিংবা ধর্মনিরপেক্ষ যে-ই হোক না কেন। তিনি বলেন, তারা ইসরায়েল, আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্বকে ঘৃণা করার জন্য তরুণদের মগজধোলাই করছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ানের কড়া সমালোচনা করে নেতানিয়াহু তাকে ‘স্বৈরাচারী’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, এরদোয়ান হাজার হাজার কুর্দি হত্যা করেছেন এবং উত্তর সাইপ্রাস অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন। জেরুজালেমের ওপর এরদোয়ানের অধিকার দাবির বিষয়টিকেও তিনি চ্যালেঞ্জ জানান। ৭ অক্টোবরের পর থেকে তুরস্ক ও ইসরায়েলের সম্পর্কে যে অবনতি ঘটেছে, তা আঙ্কারার প্রতি ইসরায়েলের অবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হয়।

গাজায় মানবিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি জানান, ইসরায়েল বেসামরিক জনগণকে রক্ষা করার জন্য সবসময়ই অগণিত পদক্ষেপ নিয়েছে এবং গাজায় পোলিও টিকা ও বিপুল খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করেছে। যদিও ত্রাণ সংস্থাগুলোর দাবি অনুযায়ী দুই মাস ত্রাণ সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে সেখানে দুর্ভিক্ষের ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল, তবে নেতানিয়াহু তার আগের অবস্থানেই অটল রয়েছেন।

নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহারান মামদানির দিকে ইঙ্গিত করে নেতানিয়াহু তাকে ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি দাবি করেন, মামদানি হামাসকে সমর্থন করেন এবং তার শহরে ইহুদিরা এখন আর নিরাপদ বোধ করছেন না। নিজের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা এবং তাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রচেষ্টাকে তিনি ‘সত্য গোপন করার’ ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

নেতানিয়াহু দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেন যে, ইহুদিরা আর অসহায় শিকার হয়ে কসাইখানায় যাওয়ার দিন শেষ হয়েছে। বর্তমানে ইসরায়েলের নিজস্ব সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্র রয়েছে। তিনি বিশ্বের ইহুদিদের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান এবং ‘বর্বরদের’ বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সবাইকে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়ানোর অনুরোধ করেন।

শেয়ার করুন