২৪ আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইলন মাস্কের নিশানায় আম্বানি, ভারতের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বাজারে অস্থিরতা

প্রকাশ:

ভারতে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা চালুর লাইসেন্স পেতে বিলম্ব হওয়ার জেরে সরাসরি মুকেশ আম্বানিকে আক্রমণ করেছেন ইলন মাস্ক। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, আম্বানিই কি ভারতের আসল বস? স্টারলিংকের ভারতে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর পথ এখনো পরিষ্কার না হওয়ায় মাস্কের এই ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে। গত বুধবার তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে, ভারতের বাজারে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী স্টারলিংকের প্রবেশ ঠেকানোর কূটকৌশল করছেন। এর এক দিন পরেই তিনি সরাসরি আম্বানির নাম উল্লেখ করেন। রিলায়েন্স গ্রুপের মালিকানাধীন জিও ভারতের সবচেয়ে বড় মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর, যারা এই বাজারে একটি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। এ বিষয়ে মুকেশ আম্বানি ও রিলায়েন্স গ্রুপের বক্তব্য জানতে চেয়েছে বিবিসি। তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি স্টারলিংকের সঙ্গে এই দুই প্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্বও রয়েছে। ওই অনুষ্ঠান চলাকালেই মাস্কের অভিযোগ ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়। দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইন্টারনেট বাজার হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সংযোগের সুযোগ এখনো সীমিত।

মাস্কের এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে ভারত সরকার তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্যাটেলাইট যোগাযোগ খাতে অনুমোদনের যে নিয়মকানুন রয়েছে, তা সম্পূর্ণ ন্যায্য এবং বৈষম্যহীন। ভারত সরকার মাস্কের অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও ভুল ধারণাপ্রসূত হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে সরকারের এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট হননি মাস্ক। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেন, বিশ্বের ১৬৫টিরও বেশি দেশে লাইসেন্স পাওয়ার পরও ভারতে কেন স্টারলিংক পিছিয়ে আছে। তিনি দাবি করেন, গত পাঁচ বছর ধরে ভারত সরকারের প্রতিটি আইন ও শর্ত মেনেই প্রতিষ্ঠানটি কাজ করছে। তাঁদের পরিচয় সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়ে মাস্ক লিখেন, ‘আপনারা অনুমান করতে পারেন, তারা কারা। এ জন্য প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টাও চলছে।

ভারতের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বাজারে বড় ধরনের প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে। রিলায়েন্স জিও এবং ভারতী এয়ারটেলও এই খাতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে কাজ করছে। মজার ব্যাপার হলো, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও ২০২৫ সালের মার্চ মাসে স্টারলিংকের মূল প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের সঙ্গে জিও ও এয়ারটেলের চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তির ভিত্তিতে সরকারি অনুমোদন সাপেক্ষে ভারতে স্টারলিংকের প্রযুক্তি ও সেবা বিতরণের কথা ছিল। আকাশ আম্বানি জানান, রিলায়েন্স জিও নিজস্ব স্যাটেলাইট প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করছে এবং তারা ভারতীয় গ্রাহকদের সাশ্রয়ী ও মানসম্মত সেবা দিতেই আগ্রহী। তবে মাস্কের অভিযোগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। অন্যদিকে, ভারতী এয়ারটেলের চেয়ারম্যান সুনীল ভারতী মিত্তাল জানিয়েছেন, তাদের স্যাটেলাইট উদ্যোগগুলোও সরকারি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার ভারতের যোগাযোগ মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করেছে যে, স্টারলিংক, ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়েব এবং জিও স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনস—এই তিনটি প্রতিষ্ঠানই বর্তমানে অনুমোদন প্রক্রিয়ার প্রায় একই অবস্থানে রয়েছে। বাণিজ্যিক সেবা শুরুর আগে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকেই নিরাপত্তা ছাড়পত্র এবং স্পেকট্রাম বরাদ্দের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। দিল্লির ইন্ডিয়া মোবাইল কংগ্রেসে এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা অংশ নেন এবং সেখানেও স্যাটেলাইট সেবার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা হয়।

উল্লেখ্য, স্টারলিংক ২০২১ সাল থেকেই ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করছে। তবে এর আগে নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এসেছিল। ২০২৪ সালে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে মাদক চোরাচালান তদন্ত এবং মণিপুরে সেনাবাহিনীর অভিযানের সময় স্টারলিংকের কিছু যন্ত্রপাতি উদ্ধার করা হয়েছিল। তখন মাস্ক পাল্টা যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ভারতে স্টারলিংকের সেবা কখনোই চালু হয়নি, তাই উদ্ধার হওয়া যন্ত্রপাতি তার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করার কোনো সুযোগ নেই।

ভারতের বাজারে স্টারলিংকের খরচ নিয়েও ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। যদিও তারা এখনো সেবার দাম ঘোষণা করেনি, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে এটি অনেকের কাছেই ব্যয়বহুল হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে স্টারলিংকের আবাসিক ইন্টারনেটের মাসিক মূল্য শুরু হয় ৫৫ ডলার থেকে। ভারতের মতো বিশাল বাজারে সাশ্রয়ী মূল্যে ইন্টারনেট সরবরাহ করা স্টারলিংকের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। এদিকে, মাস্কের এই মন্তব্য নিয়ে রিলায়েন্স গ্রুপের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। বিশেষ করে দুর্গম এলাকায়, যেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ব্রডব্যান্ড সংযোগ স্থাপন ব্যয়বহুল কিংবা কঠিন, সেখানে এ প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে।

শেয়ার করুন