৪ কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অস্ত্র হাতে অভিযান: প্রতিমন্ত্রী পদ থেকে ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ

প্রকাশ:

মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার সময় অস্ত্র হাতে নিয়ে বিতর্কের জন্ম দেওয়া ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। এরপর তিনি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন, যা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে গ্রহণ করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে গত শনিবার গেন্ডারিয়ায় একটি মাদকবিরোধী অভিযানের সময় তার অস্ত্র হাতে থাকা অবস্থায় ধারণ করা ছবি ও ভিডিও গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। তার পদত্যাগপত্র পাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্র। তিনি বলেন, গণমাধ্যমের ভূমিকায় আমি হতাশ হয়েছি, কেন আমাকে এভাবে টার্গেট করা হলো। ইশরাক বলেন, আমি মনে করছি যে আমার এই মাদকের বিরোধী অভিযান কেবলমাত্র শুরু হলো, এটি চলমান থাকবে। সেই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় ১৭ই অক্টোবর অভিযান চালানো হয়। তিনি বলেন, ঢাকা-৬ আসনসহ আশপাশের এলাকায় মাদক নির্মূল এবং জনজীবনের অন্যান্য সমস্যা নিয়ে কাজ করতে চান। তার বক্তব্য, মাদকের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এর বিস্তার কমানো সম্ভব।

সূত্রমতে, বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ার পর রোববার বিকেলে মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকের শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিমন্ত্রী ইশরাককে ডেকে মন্ত্রিসভা থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন। শুরুতে রাতেই পদত্যাগের নির্দেশের বিষয়টি অস্বীকার করেছিলেন ইশরাক। তবে পরবর্তী সময়ে সকালে অডিও বার্তার মাধ্যমে নিজের পদত্যাগের সিদ্ধান্তের বিষয়টি স্পষ্ট করেন তিনি। নিজের কারণে বিএনপি এবং সরকার যাতে কোনোভাবেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে না পড়ে অথবা প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যেন আড়ালে চলে না যায়, সেই বিবেচনায় তিনি পদত্যাগের পথ বেছে নিয়েছেন বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান। এজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আধা-সরকারি পত্র পাঠানো এবং ফাঁড়ির জন্য জায়গা নির্ধারণের উদ্যোগ নেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি।

ইশরাক দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার সময় তিনি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পেলেও মাদক নির্মূলে নিজের কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছেন। এতে প্রধানমন্ত্রী সম্মতি জানিয়ে তাকে বলেন, যেহেতু মাদকবিরোধী যুদ্ধ শুরু করেছ, তা চালিয়ে যাও। সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, তার কাছে দু’টি বৈধ লাইসেন্সধারী আগ্নেয়াস্ত্র—একটি পিস্তল ও একটি রাইফেল রয়েছে। অভিযানের দিন নিরাপত্তার খাতিরে তিনি একটি অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন, তবে তা কাউকে হুমকি দেওয়ার জন্য নয়। অভিযানের সময় লাইসেন্সধারী অন্য একটি অস্ত্র তার একজন সহকর্মীর কাছে ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, অস্ত্রটি তিনি কাউকে ভয় দেখানো বা হুমকি দেয়ার জন্য ব্যবহার করেননি।

অভিযানের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ইশরাক বলেন, গেন্ডারিয়ার ঘুণ্টিঘর ও মুন্সিরটেক এলাকাটি মাদকের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছিল। তিনি দাবি করেন, স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমেই তিনি এলাকাটিকে মাদক নির্মূলের আওতায় আনার চেষ্টা করেছিলেন। অভিযানের দিন তিনি সেখানে কিছু মাদক ব্যবসায়ীকে দেখে নিজের নিরাপত্তার জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেন। পরে এলাকাটি তল্লাশি করে বিপুল পরিমাণ হেরোইন, মাদক সেবনের সরঞ্জাম, চোরাই মোবাইল ভর্তি ব্যাগ ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ সময় পুলিশ ছয়জনকে আটক করে নিয়ে যায়। তিনি স্পষ্ট করেন যে, কারো ওপর বলপ্রয়োগ করা তার উদ্দেশ্য ছিল না, বরং আইনানুসারে অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করাই ছিল মূল লক্ষ্য। ইশরাকের ভাষ্য, দায়িত্ব নেয়ার পর তিনি স্থানীয় থানা-পুলিশের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। তিনি বলেন, ঘুণ্টিঘর এলাকায় একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের প্রস্তাবও দেয়া হয়েছিল। ইশরাকের দাবি, গত ১৮ই সেপ্টেম্বরের একটি বৈঠকে স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে এলাকাটিতে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। তার দাবি, পরে প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে এলাকায় হেঁটে বিভিন্ন স্থানে মাদক বিক্রি ও সেবনের চিত্র দেখতে পান। তবে অভিযানের বিস্তারিত তথ্য আগেভাগে জানালে তা ফাঁস হয়ে যেতে পারে- এমন আশঙ্কায় শেষ মুহূর্তে সংশ্লিষ্টদের খবর দেয়া হতো বলে তার ভাষ্য। কয়েকটি ভবনে ঢুকে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোনভর্তি একটি স্কুলব্যাগ, প্রায় ৩০০ গ্রাম হেরোইন, কয়েক বোতল মদ এবং দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এসব সামগ্রী কোথা থেকে এসেছে, তা নিয়ে সেখানে থাকা ব্যক্তিরা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি বলে দাবি করেন ইশরাক।

ভবিষ্যতে ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে নির্বাচনের বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে ইশরাক জানান, এ বিষয়ে যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মালিক দল ও দলীয় প্রধান তারেক রহমান। ২০২০ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভিজ্ঞতা ও নগরীর বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব নিয়ে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করছেন। তাই দল চাইলে তিনি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত আছেন। তবে দল যদি অন্য কাউকে মনোনয়ন দেয়, তবে তার পক্ষেও কাজ করতে তিনি দ্বিধাবোধ করবেন না।

উল্লেখ্য যে, বর্তমান সরকারের আট মাসের মেয়াদে ইশরাক হোসেন তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে পদত্যাগ করলেন। এর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসি আহমেদ মিষ্টি নিজ নিজ পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। সবশেষে নেতাকর্মীদের স্লোগান ও ভিড়ের মধ্যে দিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাব এলাকা ত্যাগ করেন ইশরাক হোসেন।

শেয়ার করুন