৫ই আগস্টের পর রাষ্ট্র সংকট ও অন্তর্বর্তী সরকারের ঐতিহাসিক দায়

প্রকাশ:

দেশের প্রথিতযশা সাংবাদিক ও সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী ৫ই আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশের বাস্তবতাকে এক গভীর রাষ্ট্রতাত্ত্বিক সংকটের প্রেক্ষাপটে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে হামলা বা দখলচেষ্টার মতো ঘটনা ঘটলেও, এর পেছনে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক দুর্বলতা ও বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের ভূমিকা থাকাটা জরুরি বিষয়। তবে এই বিতর্কের মূল গুরুত্ব নিহিত রয়েছে রাষ্ট্রের কার্যক্ষমতার সংকটে।

২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট কেবল একটি রাজনৈতিক সরকারের পতন ঘটায়নি, বরং রাষ্ট্রের কার্যক্ষমতার ধারাবাহিকতাকেও এক অভূতপূর্ব সংকটে ঠেলে দিয়েছিল। সরকার প্রধান দেশত্যাগ করেছিলেন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বড় অংশ নিরাপত্তাহীনতার কারণে কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করায় রাষ্ট্রের বৈধ coercive authority অচল হয়ে পড়েছিল। একই সময়ে জাতীয় সংসদ বিলুপ্ত হয়, স্পিকারসহ সংসদ সদস্যদের একটি বড় অংশ আত্মগোপনে যান এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অনেকে নিরাপত্তাজনিত কারণে প্রকাশ্য কার্যক্রম থেকে সরে দাঁড়ান। এমনকি রাষ্ট্রপতিও বঙ্গভবনে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থার বিশেষ পরিস্থিতির মধ্যে অবস্থান করছিলেন। ফলে রাষ্ট্রের নির্বাহী, আইনসভা ও বিচার বিভাগ—তিনটি সাংবিধানিক অঙ্গই একই সময়ে কার্যক্ষমতা হারায়।

মতিউর রহমান চৌধুরীর মতে, অন্তর্বর্তী সরকারকে একটি স্বাভাবিক ও কার্যকর রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিতে হয়নি। তাকে এমন এক রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল যার পুরনো রাজনৈতিক বৈধতা গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, কিন্তু নতুন বন্দোবস্ত তখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে পুরনো বৈধতা ও নতুন গণতান্ত্রিক বৈধতার মধ্যে একটি সাংবিধানিক সেতু হিসেবে কাজ করা ছিল সরকারের ঐতিহাসিক সংকট।

তিনি আরও বলেন, গণ-অভ্যুত্থান জনগণের মৌলিক রাজনৈতিক ক্ষমতা বা Constituent Power-এর বহিঃপ্রকাশ ঘটায়, যা পুরনো কাঠামো ভেঙে নতুন Constituted Power নির্মাণের দাবি তোলে। এই রূপান্তরের মধ্যবর্তী শূন্যতায় রাষ্ট্রের নিরাপত্তা চরম হুমকিতে পড়েছিল। এই বাস্তবতায় অন্তর্বর্তী সরকারের তিনটি প্রধান ঐতিহাসিক দায়িত্ব ছিল—নির্বাচন আয়োজন, রাষ্ট্র সংস্কার এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো, প্রশাসন, নির্বাচন ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক পরিবেশ ৫ই আগস্টের পর বিপর্যস্ত ছিল। সংস্কারের ক্ষেত্রে জুলাই সনদ ও গণভোটের মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামোর ভিত্তি তৈরি করেছে। এছাড়া হত্যা ও নির্যাতনের বিচার প্রক্রিয়া শুরু করাকেও তিনি রাষ্ট্রের নৈতিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

পরিশেষে, তিনি রাজনৈতিক সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, কেবল সরকারের ভুলের তালিকা তৈরি না করে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের এই কঠিন সময়কে ইতিহাসের নির্মোহ দৃষ্টিতে বিচার করা প্রয়োজন। অন্তর্বর্তী সরকারকে অন্ধ সমর্থন বা একতরফা নিন্দা না করে, তাকে তার পূর্ণ বাস্তবতার মধ্যে মূল্যায়ন করাই হবে যুক্তিসঙ্গত। কারণ ৫ই আগস্টের ইতিহাস শুধু পতনের ইতিহাস নয়, এটি একটি অকার্যকর রাষ্ট্রকে পুনরায় কার্যকর করার ইতিহাসও।

শেয়ার করুন