সদ্য ঘোষিত জাতীয় বেতনকাঠামোয় সরকারি চাকরিতে নতুন করে যোগ দেওয়া ব্যক্তিদের বেতন-ভাতা তুলনামূলক বেশি হবে। তবে যাঁরা ইতিমধ্যে চাকরিতে আছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে হিসাবটা ভিন্ন। চাকরির মেয়াদ, বর্তমান মূল বেতন ও ইনক্রিমেন্টের কারণে তাঁদের বেতন একেক রকম হবে। বর্তমানে সরকারি চাকরির ২০টি গ্রেড রয়েছে। এর মধ্যে বিসিএস ক্যাডারসহ প্রথম শ্রেণির চাকরি হিসেবে পরিচিত অধিকাংশ নিয়োগ হয় নবম গ্রেডে। অন্যান্য নিয়োগ শুরু হয় ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডে। উদাহরণস্বরূপ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পদে জাতীয় বেতন স্কেলের ১৩তম গ্রেডে নিয়োগ হয় এবং প্রধান শিক্ষকের পদটি দশম গ্রেডের। জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী নবম গ্রেডে মূল বেতন ছিল ২২ হাজার টাকা, যা নতুন বেতনকাঠামোয় দ্বিগুণ হয়ে ৪৪ হাজার টাকা করা হয়েছে। কোনো কোনো পদে যোগদানের সময় একটি অতিরিক্ত ইনক্রিমেন্টও দেওয়া হয়।
সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতনকাঠামো ২০২৬ গতকাল সোমবার অনুমোদন করা হয়েছে। এতে গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। মূল বেতন ও ভাতাসহ মোট চার ধাপে এই বেতনকাঠামো বাস্তবায়িত হবে এবং তা গত জুলাই থেকে কার্যকর হবে। নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে এত দিন চালু থাকা মূল বেতনের ১৫ শতাংশ ‘বিশেষ সুবিধা’ অবলুপ্ত বা বাতিল হয়ে যাবে।
প্রথম থেকে নবম গ্রেডের ক্ষেত্রে প্রথম ধাপে জুলাই থেকে নতুন বর্ধিত মূল বেতনের ৪০ শতাংশ কার্যকর হবে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে দ্বিতীয় ধাপে আরও ৩০ শতাংশ এবং ২০২৭ সালের জুলাই থেকে তৃতীয় ধাপে বাকি ৩০ শতাংশ কার্যকর হবে। বাড়িভাড়াসহ নতুন সব ভাতা চতুর্থ ধাপে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে যুক্ত হবে, তবে এই সময়ে আগের ভাতাগুলো বহাল থাকবে। স্বল্প আয়ের কর্মচারীদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিজীবীদের নতুন বেতন বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার। এসব গ্রেডের জন্য প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ বর্ধিত মূল বেতন, দ্বিতীয় ধাপে ২৫ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে অবশিষ্ট ২৫ শতাংশ কার্যকর হবে। তারাও সব ভাতা চতুর্থ ধাপে পাবেন। এছাড়া সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য মোবাইল ফোনের ভাতাও নতুন বেতনকাঠামোয় যুক্ত করা হয়েছে।
একজন নতুন চাকরিজীবী চলতি বছরের জুলাইয়ে নবম গ্রেডে যোগ দিলে, তাঁর মূল বেতন প্রথম ধাপে ৪০ শতাংশ বেড়ে ৩০ হাজার ৮০০ টাকা হবে। দ্বিতীয় ধাপে আরও ৬ হাজার ৬০০ টাকা যোগ হয়ে মূল বেতন দাঁড়াবে ৩৭ হাজার ৪০০ টাকা। তৃতীয় ধাপে অর্থাৎ ২০২৭ সালের জুলাই থেকে আরও ৬ হাজার ৬০০ টাকা যোগ হলে মূল বেতন হবে ৪৪ হাজার টাকা। ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন হারে ভাতা কার্যকর হলে ঢাকায় কর্মরত নবম গ্রেডের একজন নতুন কর্মকর্তার মোট বেতন-ভাতা ৭০ হাজার টাকার কাছাকাছি হতে পারে। ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে এই গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন ১ লাখ ৫ হাজার ৯০০ টাকা হওয়ার সুযোগ আছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের (১০ম গ্রেড) ক্ষেত্রে চাকরির শুরুতে পুরোনো মূল বেতন ১৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে নতুন কাঠামোয় শুরুতে হবে ৩২ হাজার টাকা। প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ বাড়লে মূল বেতন হবে ২৪ হাজার টাকা, দ্বিতীয় ধাপে ২৮ হাজার টাকা এবং তৃতীয় ধাপে ৩২ হাজার টাকা হবে। ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে বর্ধিত বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য ভাতা যুক্ত হলে এই গ্রেডের একজন নতুন কর্মকর্তার মোট বেতন-ভাতা ৫০ হাজার টাকার বেশি হবে। ইনক্রিমেন্টের মাধ্যমে এই গ্রেডের সর্বোচ্চ মূল বেতন হবে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা।
পুরোনোদের ক্ষেত্রে হিসাবটি ভিন্ন, কারণ তাঁদের বর্তমান মূল বেতন, চাকরির মেয়াদ ও ইনক্রিমেন্টের ওপর মোট বেতন নির্ভর করে। ঢাকার এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, যিনি এক যুগের বেশি সময় ধরে কর্মরত, জানান যে তাঁর বর্তমান মূল বেতন ২২ হাজার ৪৫০ টাকা। নতুন কাঠামোয় প্রথম ধাপে তাঁর মোট বেতন ৪০ হাজার টাকা এবং পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের পর তা ৭০ হাজার টাকার কাছাকাছি হতে পারে। একইভাবে ১৭ বছর চাকরি করা নোয়াখালীর একজন সহকারী শিক্ষকের বর্তমান মূল বেতন ২০ হাজার ৮০০ টাকা। নতুন কাঠামোয় প্রথম ধাপে তাঁর মূল বেতন হবে ২৭ হাজার ৩০০ টাকার কাছাকাছি এবং সব ধাপ বাস্তবায়িত হলে মোট বেতন-ভাতা প্রায় ৫০ হাজার টাকা দাঁড়াতে পারে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের ১৩তম গ্রেডের মূল বেতন ১১ হাজার টাকা থেকে শুরু হতো, যা নতুন কাঠামোয় ২৪ হাজার টাকা দিয়ে শুরু হবে এবং সর্বোচ্চ ৫৮ হাজার টাকা পর্যন্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি মঙ্গলবার জানিয়েছেন, নতুন বেতনকাঠামো-সংক্রান্ত আদেশ অর্থ বিভাগ থেকে আগামীকাল বা পরশু জারি করা হবে, তখন সব বিষয় স্পষ্টভাবে জানা যাবে।





