নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বে ইরান: কতটা বদলাবে দেশটির নীতি?

প্রকাশ:

গত মাসে ভার্সাই প্রাসাদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই চুক্তিটি ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তির সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে, যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ইউরোপের মানচিত্র বদলে দিয়েছিল। যদিও বর্তমান চুক্তিটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে স্বাক্ষরিত হয়েছে, তবুও এর ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন সপ্তাহ পরও যুদ্ধবিরতি মোটামুটিভাবে টিকে আছে, তবে হরমুজ প্রণালির আশেপাশে কিছু সংঘর্ষের ঘটনা পরিস্থিতিকে এখনো অনিশ্চিত করে রেখেছে। এই সময়ে ইরান এক গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বিদায় নিয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের শাসনব্যবস্থার একটি বড় অংশ নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়েছিল। এটি দেশটির জন্য একটি যুগান্তকারী মুহূর্ত, যা পুরনো নেতৃত্বের অবসান এবং নতুন প্রজন্মের উত্থানের ইঙ্গিত বহন করছে।

জনস হপকিনস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ভ্যালি নাসর মনে করেন, এই যুদ্ধের প্রভাব প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি গভীর এবং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নতুনভাবে সাজিয়ে দেবে। যদিও জানুয়ারিতে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছিল এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির অর্থনীতি বিপর্যস্ত ছিল, তবুও ইরান তার ইসলামি প্রজাতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এর একটি বড় কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।

অধ্যাপক নাসর আরও উল্লেখ করেন যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন বলে দাবি করলেও, শেষ পর্যন্ত এই পরিবর্তন তেহরানের পক্ষেই গেছে। ইরানে এখন এমন একটি নতুন প্রজন্ম ক্ষমতায় এসেছে যাদের লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট। তারা যুদ্ধ পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে এবং এখন শান্তিচুক্তি ও অন্যান্য বিষয়গুলোও কার্যকরভাবে পরিচালনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই নতুন নেতৃত্বকে ‘মতাদর্শিক’ হিসেবে চিহ্নিত না করে বরং বিপ্লব-পরবর্তী প্রজন্মের নেতা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যারা দেশ রক্ষায় আগের নেতৃত্বের চেয়ে অনেক বেশি দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।

নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি, যিনি ৫৬ বছর বয়সী, তার বাবা আলী খামেনির চেয়ে ৩০ বছরের ছোট। এছাড়া, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের বয়স ৭১ হলেও, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের প্রজন্মের অনেকেই এখন আর ক্ষমতায় নেই। বর্তমান ইরানের প্রধান দুই ব্যক্তি—পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং বিপ্লবী গার্ডের প্রধান আহমাদ বাহিদি, উভয়েই ষাটের ঘরে। নতুন সর্বোচ্চ নেতার মতো তাদেরও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

চ্যাথাম হাউসের পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব এখন আর প্রবীণদের হাতে নেই। আলী খামেনি, যিনি দশকের পর দশক ধরে ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ নীতি অনুসরণ করেছিলেন, তিনি ব্যবস্থার বিকাশে সবচেয়ে বড় বাধা ছিলেন। তার উত্তরসূরিরা তুলনামূলকভাবে সাহসী এবং তারা অঞ্চলের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালানোর মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই এমন একটি যুদ্ধ শেষের আলোচনা টেবিলে এসেছে যা তেহরানের জন্য অপমানজনক নয়।

অধ্যাপক নাসরের মতে, এই নতুন নেতৃত্ব আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মকভাবে যুদ্ধে জড়াতে প্রস্তুত। ২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার প্রতিক্রিয়ায় ইরান মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর আগে প্রতিশোধের কথা জানিয়ে দিয়েছিল এবং কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি। কিন্তু এ বছর মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার মুখে ইরান কোনো সংযম দেখায়নি। তারা বাহরাইনে ফিফথ ফ্লিটের সদর দপ্তর এবং কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটিসহ বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যেখানে কুয়েতে ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং শত শত আহত হয়েছেন।

উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন মিত্রদের ওপর এই আগ্রাসী মনোভাব সম্ভবত হোয়াইট হাউসকে অবাক করেছে। আলী ওয়ায়েজ, ইন্টারন্যাশনল ক্রাইসিস গ্রুপের একজন কর্মকর্তা, মনে করেন যে ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখার মার্কিন কৌশল এখন আর কার্যকর নয়। উপসাগরীয় দেশগুলো মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলছে যে, বেশিরভাগ উপসাগরীয় দেশ ইরানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। সৌদি আরব ২০২৩ সালে তেহরানের সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের পর একটি ‘পুনর্মিলন সম্মেলন’ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ওয়ায়েজ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে, এই দেশগুলো মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে প্রস্তুত না হলেও, তারা ঝুঁকি কমাতে চাইছে। তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি ‘প্লাস্টিক মোমেন্ট’ বা পরিবর্তনশীল মুহূর্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন, যা পুরনো শত্রুদের মধ্যে ভিন্ন মাত্রার সম্পর্কের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

দেড় পৃষ্ঠার ওই চুক্তি এবং এই ভেন্যু নির্বাচনের বিষয়টি ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তির তুলনা টেনে আনে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে স্বাক্ষরিত সেই চুক্তি ইউরোপকে নতুন রূপ দিয়েছিল। তবে জার্মানির ওপর বিপুল ক্ষতিপূরণ চাপানোয় দেশটিতে ব্যাপক ক্ষোভ ও তিক্ততা জন্ম নেয়, যা মাত্র ২০ বছর পর আরেকটি বৈশ্বিক সংঘাতের পথ তৈরি করেছিল। বর্তমান চ

অথচ গত জানুয়ারিতে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছিল, যাকে মি. ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখেছিলেন। দশকের পর দশক আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি আগে থেকেই বিপর্যস্ত ছিল। ছয় মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের যুদ্ধের ক্ষতও

শেয়ার করুন