৩২ বছরের পুরোনো ওষুধ নীতিতে ফেরা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

প্রকাশ:

বাংলাদেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি চিকিৎসা ব্যয় সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক পরিবার নিয়মিত ডাক্তার দেখানো, টেস্ট করানো এবং ওষুধ কেনার খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। ঢাকার এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মাজহারুল ইসলামের মতো অনেকেই বলছেন, পরিবারের চিকিৎসা ব্যয় মেটানো তাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই মন্ত্রিসভা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় প্রণীত ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০২৬’ বাতিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকার জানিয়েছে, জাতীয় ড্রাগ অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের পরামর্শ না নেওয়া এবং আইনি জটিলতার কারণে তারা তিন দশক আগের ১৯৯৪ সালের নীতিতে ফিরে যাচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তকে অযৌক্তিক বলে মনে করছেন। তাদের মতে, ১৯৯৪ সালের নীতিতে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংখ্যা ছিল ১১৭টি, যা ২০১৬ সালে বাড়িয়ে ২৮৫টি এবং ২০২৫ সালে ২৯৫টি করা হয়েছিল। এখন পুরনো নীতিতে ফিরে যাওয়ায় অনেক প্রয়োজনীয় ওষুধ তালিকা থেকে বাদ পড়ার পাশাপাশি ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের কর্তৃত্ব কমে যেতে পারে। ডা. মুশতাক হোসেনের মতে, ১৯৯৪ সালের অনেক ওষুধ এখন অকার্যকর বা অপ্রচলিত, তাই তালিকা বাতিল না করে সংশোধন করা যেত।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে চিকিৎসার প্রায় ৮০ শতাংশ খরচ রোগীদের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যেখানে থাইল্যান্ডে এই হার ১০ শতাংশ এবং মালদ্বীপে ১৮ শতাংশ। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, দরিদ্র পরিবারগুলো আয়ের প্রায় ৩৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি অনুযায়ী এসব ওষুধ সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী দামে নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ১৯৭৭ সাল থেকেই অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা বা মডেল এসেনশিয়াল মেডিসিন লিস্ট প্রতি দুই বছর পর পর হালনাগাদ করছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক ছিল, যা ২০২৬ সালের তালিকা প্রণয়নের সময় করা হয়নি। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ১৯৮২ সালের ওষুধ নীতির ফলেই বাংলাদেশে ওষুধ শিল্প একটি শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়েছে। তাদের উৎপাদন, বাণিজ্য, রফতানি বেড়েছে। কিন্তু তারা যদি জনস্বাস্থ্যের বিষয়ে সহযোগিতা না করে, তাহলে ফার্মা কোম্পানির বিরুদ্ধেও ভবিষ্যতে যে-কোনো সিদ্ধান্ত নিতে সরকার উৎসাহ পাবে। এছাড়া বাংলাদেশ ইউনানি মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির রিটের কারণে এই তালিকায় আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছিল। সরকার এখন নতুন তালিকা হালনাগাদের প্রতিশ্রুতি দিলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে দীর্ঘমেয়াদি রোগীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং চিকিৎসা ব্যয় কমার পরিবর্তে আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

শেয়ার করুন