২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা সাড়ে আট বছর বয়সী বাসিত খান মুসা এখন বাড়িতে। ১৬ জুলাই রাজধানীর মালিবাগের নতুন ভাড়া বাসায় ফুফাতো ভাই-বোনদের সঙ্গে লেগো দিয়ে রোবট বানাতে দেখা যায় তাকে। তার এই হাসি হৃদয় জুড়ালেও, দুই বছর ধরে দীর্ঘ চিকিৎসা, অসংখ্য অস্ত্রোপচার আর অনিশ্চয়তার ছায়া এখনো তার জীবনকে ঘিরে রেখেছে। যে বয়সে তার মাঠে ছুটে বেড়ানোর কথা, সে বয়সে তাকে লড়তে হচ্ছে একটি গুলির রেখে যাওয়া ক্ষতের সঙ্গে।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই রাজধানীর রামপুরার মেরাদিয়া হাট এলাকায় ছেলের জন্য আইসক্রিম কিনতে বাসার নিচে নেমেছিলেন মুসার বাবা মুস্তাফিজুর রহমান। বাবার পেছনেই ছিল মুসা, আর তার পেছন পেছন নেমে এসেছিলেন দাদি মায়া ইসলাম (৬০)। বাসার মূল ফটকের ভেতরেই মুসার মাথায় গুলি লাগে। সেই গুলি মুসার মাথা ভেদ করে দাদির পেট ফুঁড়ে দেয়ালে গিয়ে লাগে। পরদিন ২০ জুলাই মুসার দাদির মৃত্যু হয়। এরপর থেকেই গুলিবিদ্ধ ছোট্ট মুসার শুরু হয় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই।
প্রথমে মুসাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পরে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। তিন মাস ধরে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ওই বছরের ২২ অক্টোবর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। মুসাকে বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রথম আলোর ধারাবাহিক প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রথম আলো ২৪ সালের ২৮ জুলাই ‘মা একটু পরপর ছেলের বুকের কাছে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করছেন নিশ্বাস নিচ্ছে কি না’ শিরোনামে প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দেশে মুসার চিকিৎসা আর সম্ভব নয় জানার পর ৭ অক্টোবর ‘আন্দোলনকালে গুলিবিদ্ধ শিশু মুসাকে সিঙ্গাপুরে নিতে বলছেন চিকিৎসকেরা, কে দেবে এত টাকা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই সংবাদ প্রকাশের পর চ্যানেল আই মুসাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানোর জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে। সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের ২০তম ব্যাচের চিকিৎসকদের উদ্যোগে দেশে-বিদেশে অবস্থানরত চিকিৎসক, প্রবাসী ও দেশের মানুষ অর্থসহায়তা দিয়ে মুসার পাশে দাঁড়ান। সরকার সিঙ্গাপুরের হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে মুসার চিকিৎসা নিশ্চিত করে।
প্রায় সাড়ে পাঁচ মাস চিকিৎসা শেষে গত বছরের ৩ এপ্রিল মুসাকে নিয়ে দেশে ফেরেন মা-বাবা। বিমানবন্দর থেকে তাকে সরাসরি নেওয়া হয় সিএমএইচে, যেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসা চলে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মুসা ৩ মাস চোখ খোলেনি এবং ৯ মাস মুখে কোনো শব্দ ছিল না। সিঙ্গাপুরে কিছুটা সুস্থ হলেও কথা বলতে পারত না, এমনকি ব্যথা পেলেও আওয়াজ করে কাঁদতে পারত না। ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল সিএমএইচে ফিজিওথেরাপি দেওয়ার সময় হঠাৎ সে শব্দ করে কাঁদতে শুরু করে। আরেক দিন ফিজিওথেরাপি দেওয়ার সময় সে বলে ওঠে, ‘ব্যথা, ব্যথা।’ এরপর থেকে ‘মাম্মি’, ‘আন্টি’ ও ‘দাদা’র মতো টুকটাক শব্দ বলা শুরু করে। এখন সে অল্প অল্প কথা বলতে পারে, বাংলা ও ইংরেজিতে সংখ্যা গোনে, এ বি সি ডি বলতে পারে এবং ছোট ছোট ছড়া বলতে পারে। টয়লেটে যাওয়ার কথাও বলতে পারে, তবে জিবে এখনো আড়ষ্টতা আছে।
সিঙ্গাপুরে যাওয়ার আগে মুসা কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র ছাড়া শ্বাস নিতে পারত না, খিঁচুনি হতো, শরীরে ভয়াবহ সংক্রমণ ছিল এবং অ্যান্টিবায়োটিকও কাজ করছিল না। চোখের পাতাও নাড়াতে পারত না। সিঙ্গাপুরে ব্যয়বহুল ওষুধে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসে এবং চিকিৎসায় ধীরে ধীরে তার অবস্থার উন্নতি হয়। সিঙ্গাপুরে দীর্ঘ সময়ের চিকিৎসায় মুসার মাথা, গলা ও পেটে ২০টির বেশি অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।
বর্তমানে মুসা রাজধানীর মালিবাগে তার নতুন বাসায় ফুফাতো ভাই-বোনদের সঙ্গে খেলছে। তার পরনে ছিল স্পাইডারম্যানের ছবি আঁকা টি-শার্ট। স্পাইডারম্যান এখনো তার প্রিয় চরিত্র। সে এক হাত দিয়ে লেগো জোড়া লাগিয়ে কয়েক মিনিটেই একটি রোবট বানিয়ে ফেলে। তবে গুলির আঘাতে তার ডান পাশ এখনো পক্ষাঘাতগ্রস্ত। সোফায় বসে বাবা ডান পায়ে বিশেষ জুতা পরিয়ে দিলে মুসা পা ফেলতে চাইলেও তা আবার ঝুলে পড়ে। একসময় যে শিশুটি ছুটে বেড়াত, এখন তার প্রতিটি পদক্ষেপই অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। বাইরে যেতে হলে হুইলচেয়ারই তার ভরসা।
মুসার মা নিশামনি একটি পোশাক বিপণন কেন্দ্রে চাকরি নিয়েছেন। মুসার ফুফু কেয়া ইসলাম জানান, মুসার অসুস্থতার কারণে এখন সবাই এক বাড়িতে থাকেন, যাতে সবাই মিলে তার দেখভাল করতে পারেন এবং সে খেলার সঙ্গী পায়। সিএমএইচের পেডিয়াট্রিক নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক কর্নেল নাজমুল হামিদ সে সময় প্রথম আলোকে বলেছিলেন, “আমরা খুবই আশাবাদী মুসা সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠবে। ও একা একা আবার হাঁটতে পারবে। সুস্থতার জন্য ওর দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা লাগবে। ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি ও স্পিচ থেরাপি লাগবে।”
মুসার বাবা মুস্তাফিজুর রহমান জানান, সংক্রমণের ঝুঁকির কারণে মুসাকে নিয়মিত হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ফিজিওথেরাপি করানো যাচ্ছে না। বাসায় থেরাপিস্ট আনতে যে খরচ লাগে, তা বহন করা পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়। ইলেকট্রনিক সামগ্রীর দোকান করে যে আয় হয়, তা দিয়ে চিকিৎসার এত ব্যয় মেটানো যায় না। কোনো উপায় না পেয়ে গত বছরের জুলাই মাসে মুসার বাবা বাসায় বিনা মূল্যে ফিজিওথেরাপির ব্যবস্থার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিলেন, কিন্তু এখনো কোনো সাড়া পাননি।
মুসার বাবার বড় দুশ্চিন্তা সিঙ্গাপুরে ফলোআপ চিকিৎসা নিয়ে। গত বছরের ১৪ জুন সিএমএইচ নিউরোসার্জারি বোর্ড থেকে মুসার চিকিৎসাসংক্রান্ত সারসংক্ষেপে সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকের ফলোআপ করার পরামর্শের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এরপর জুলাই মাসে মুসার পরিবার সরকারি ব্যয়ে সিঙ্গাপুরে মুসার ফলোআপ চিকিৎসায় যায়। কিন্তু গত বছরের ডিসেম্বরে এবং চলতি বছরের ১৫ মে ফলোআপে যাওয়ার তারিখ থাকলেও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অনুমোদন পাননি তারা। গত ১১ মে সিএমএইচের চার সদস্যের মেডিকেল বোর্ড, যার সভাপতি জ্যেষ্ঠ নিউরোসার্জন অধ্যাপক কর্নেল মো. আল আমিন সালেক, আবারও সিঙ্গাপুরে ফলোআপের পরামর্শের বিষয়টি উল্লেখ করে। মুসার বাবা ২৫ মে সিএমএইচের সুপারিশ করা চিঠি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে গিয়ে নিজে পৌঁছে দিয়ে এসেছেন।
মুসা সব খাবার স্বাভাবিকভাবে খেতে পারে, তবে তার নাকে এখনো খাবারের নল লাগানো। নল দিয়ে দুধজাতীয় খাবার দিতে হয়। এ জন্য বিশেষ টিনজাত পুষ্টিকর খাবার ও ওষুধের ওপর তাকে নির্ভর করতে হয়। মুসার বাবা জানান, সিঙ্গাপুর থেকে আনা সেই খাবার গত জানুয়ারিতে শেষ হয়েছে, আর ওষুধও প্রায় শেষ। এ কারণে ছেলেকে নিয়ে তাঁদের দুশ্চিন্তা কাটছে না।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব মো. মুস্তাফিজুর রহমান ১৯ জুলাই প্রথম আলোকে বলেন, “মুসার বিষয়ে তাঁদের আন্তরিকতার কোনো কমতি নেই। জুলাই আহত ব্যক্তিদের বিদেশে ফলোআপ চিকিৎসা করার জন্য একটি কমিটি আছে। সেই কমিটি ফলোআপের প্রয়োজনীয়তা যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত দেয়। মুসার ফলোআপ-সংক্রান্ত চিঠি কমিটির বিবেচনাধীন। আর মুসার ফিজিওথেরাপি অব্যাহত রাখা বা বাসায় করানোর বিষয়ে কী করা যায়, সেটাও তাঁরা দেখছেন।” মুসার বাবা মুস্তাফিজুর রহমান সংশ্লিষ্টদের কাছে আকুতি জানিয়ে বলেন, “মুসা যেন পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে, সে কারণে আরেকটু সহযোগিতা প্রয়োজন। তা না হলে ও আবার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। আমরা সবাই মিলে এত কষ্ট করলাম! ও এত কষ্ট সহ্য করল! সব বৃথা হয়ে যাবে!”





