আজ ১ সেপ্টেম্বর, আন্তর্জাতিক চিঠি দিবস। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জার, এসএমএস বা হোয়াটসঅ্যাপের তাৎক্ষণিক বার্তার ভিড়ে হাতে লেখা চিঠির সেই চিরচেনা আবেদন অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে। একসময় চিঠিই ছিল দূরে থাকা আপনজনের সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। শুধু খবরের আদান-প্রদান নয়, মনের গহীনে জমে থাকা না বলা কথাগুলো সযত্নে সাজিয়ে তোলার অনন্য মাধ্যম ছিল এই চিঠি।
চিঠির ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। একসময় যুদ্ধক্ষেত্রে সাহস জোগানো বার্তা, প্রেমের অনুভূতি প্রকাশ, চাকরির খবর, পদোন্নতি কিংবা নতুন প্রাণের আগমনবার্তাসহ জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তের সাক্ষী ছিল এই চিঠি। হাতে লেখা চিঠির ব্যক্তিগত স্পর্শ ডিজিটাল বার্তায় পাওয়া সম্ভব নয়। নব্বইয়ের দশকের আগে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে চিঠি ছিল এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
জানা যায়, ২০১৪ সালে অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক রিচার্ড সিম্পকিনের হাত ধরে আন্তর্জাতিক চিঠি দিবসের প্রচলন শুরু হয়। নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে সিম্পকিন দেশের বড় ব্যক্তিত্বদের চিঠি লিখতেন। অনেক সময় উত্তর না পেলেও, উত্তর পাওয়ার মুহূর্তটি তাঁর কাছে ছিল পরম আনন্দের। সেই আনন্দ ও ভালোবাসা থেকেই তিনি এই দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেন, যাতে চিঠি লেখার ঐতিহ্য আবার ফিরে আসে।
চিঠির সাহিত্যমূল্যও বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘স্ত্রীর পত্র’ বা কাজী নজরুল ইসলামের ‘বাঁধনহারা’র মতো পত্রোপন্যাস আমাদের মুগ্ধ করেছে। এছাড়া নেলসন ম্যান্ডেলা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারাবন্দি অবস্থায় লেখা চিঠিগুলো ঐতিহাসিক দলিলের মর্যাদা পেয়েছে। মহাত্মা গান্ধী, আলবার্ট আইনস্টাইন, জওহরলাল নেহরু কিংবা হিটলার ও মুসোলিনির চিঠিপত্র আজও ইতিহাসের পাঠ দেয়। এমনকি কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে বন্দি ইহুদিদের লেখা চিঠিগুলো সেই দুঃসহ সময়ের সাক্ষী হয়ে আছে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে আজও স্কুল, লাইব্রেরি ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে চিঠি দিবস ঘিরে নানা আয়োজন হয়। কর্মশালা ও প্রদর্শনীর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে এই ঐতিহ্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়। যদিও ই-মেইল বা মেসেজিংয়ের ভিড়ে চিঠির প্রয়োজন ফুরিয়েছে, তবুও চিঠির সেই মায়া ও আবেগ আজও অনেকের হৃদয়ে অমলিন। আন্তর্জাতিক চিঠি দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়, বরং এটি আমাদের সেই অতীতকে স্মরণ করার ও অনুভূতির গভীরতায় ফিরে যাওয়ার একটি সুযোগ।





