পাঁচ মাসে রেকর্ড ২৫ হাজার কোটি টাকার বিদেশি ঋণ শোধ করল সরকার

প্রকাশ:

গত ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (08 September 2026) তারিখে প্রকাশিত অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম পাঁচ মাসেই বিদেশি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে নতুন রেকর্ড গড়েছে বর্তমান বিএনপি সরকার। গত মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ মোট ২০৪ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৫ হাজার ১৬৩ কোটি টাকার সমান। পাঁচ মাসের ব্যবধানে বিদেশি ঋণ পরিশোধের ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ পরিমাণ।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া বিপুল পরিমাণ ঋণের কিস্তি পরিশোধের বড় চাপের মধ্যেও নিয়মিতভাবে এই দায় শোধ করা হচ্ছে। গত বছরের একই সময়ে বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ছিল ১৮৯ কোটি ৭১ লাখ ডলার বা প্রায় ২৩ হাজার ৩১০ কোটি টাকা। সেই তুলনায় এক বছরের ব্যবধানে এবার ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ১৫ কোটি ৪ লাখ ডলার বা প্রায় ১ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা।

ইআরডির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরের মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত সময়ে পরিশোধিত অর্থের মধ্যে ঋণের আসল বাবদ দেওয়া হয়েছে ১৩৫ কোটি ২৪ লাখ ডলার এবং সুদ বাবদ পরিশোধ করা হয়েছে ৬৯ কোটি ৫২ লাখ ডলার। এই পাঁচ মাসে সরকারকে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪১ কোটি ডলার করে বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়লাভের পর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই পূর্ববর্তী সরকারের আমলে নেওয়া বিদেশি ঋণের ক্রমবর্ধমান কিস্তি পরিশোধ করা বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। তবে নানা অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও নিয়মিত ঋণ পরিশোধের ধারা বজায় রেখেছে সরকার। নীতিনির্ধারকদের মতে, বিগত সরকারের সময়ে বড় অবকাঠামো ও মেগা প্রকল্পের নামে নেওয়া ঋণের একটি বড় অংশের গ্রেস পিরিয়ড বা অবকাশকাল শেষ হওয়ায় বর্তমান সময়ে আসল ও সুদ পরিশোধের চাপ অনেক বেড়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এ বিষয়ে বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিগত আওয়ামী লীগ সরকার মেগা প্রকল্প ও অবকাঠামোর নামে ব্যাপকভাবে ঋণ নিয়েছিল। তবে এসব ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকল্পের 'ভ্যালু ফর মানি' বা অর্থের বিপরীতে প্রত্যাশিত সুফল এবং সুদের হারের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি। এছাড়া বিদ্যুৎ খাতে ক্যাপাসিটি চার্জসহ বিভিন্ন কারণে বড় ধরনের আর্থিক দায় ও ভর্তুকির বোঝা তৈরি হয়েছে, যা এখন বর্তমান সরকারকে সামলাতে হচ্ছে।

উপদেষ্টা আরও উল্লেখ করেন, একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পাওয়ার পরও সরকার অগ্রাধিকার দিয়ে নিয়মিতভাবে এই ঋণ পরিশোধ করে যাচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর ঋণের বোঝা রেখে যাওয়ার বিগত সরকারের যত্রতত্র ঋণ নেওয়ার নীতির বিপরীতে বর্তমান সরকার অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এখন থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বিনিয়োগ, বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের গতিশীলতা, ঋণের বিপরীতে রিটার্ন এবং কর্মসংস্থান তৈরির বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। শুধু অর্থ সংগ্রহ নয়, বরং বিনিয়োগ থেকে কতটা অর্থনৈতিক সুফল আসবে, তা বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

ইআরডির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে ২৬৭ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছিল, সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ ৩৭ কোটি ডলারে। পরবর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৪০৯ কোটি ডলার এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ৪৪৯ কোটি ডলারে পৌঁছায়, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ বেশি। মূলত আগের বছরগুলোতে নেওয়া বড় অঙ্কের প্রকল্প ঋণের কিস্তি এখন পরিশোধযোগ্য হয়ে ওঠায় সরকারের এই দায় বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে নিয়মিত ঋণ পরিশোধের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও ঋণদাতাদের কাছে দেশের আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও দায় পরিশোধের সক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা।

শেয়ার করুন