গ্যাস সঙ্কটের নেপথ্যে বিগত সরকারের দীর্ঘমেয়াদী অব্যবস্থাপনা

প্রকাশ:

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন দেয়া হলেও এসব কেন্দ্র সচল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাথমিক জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদী নিশ্চয়তা নিশ্চিত করা হয়নি। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের চলমান গ্যাস সঙ্কট মূলত দীর্ঘদিনের নীতিগত দুর্বলতা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে বিনিয়োগের অভাব এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার সাথে জ্বালানি সরবরাহের সমন্বয়হীনতার ফল। সাম্প্রতিক এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি বা বৈরী আবহাওয়া এই সঙ্কটের একমাত্র কারণ নয়।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বিডি রহমত উল্লাহর মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়েছিল। দ্রুত সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হলেও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়নি। এর ফলে একদিকে কেন্দ্র বসিয়ে রেখে বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালানির অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তিনি পুরনো গ্যাসকূপ সংস্কার, আধুনিকায়ন, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বঙ্গোপসাগরে গ্যাস অনুসন্ধানে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

২০১২ ও ২০১৪ সালে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পরও বঙ্গোপসাগর থেকে গ্যাস উত্তোলনে বাংলাদেশের প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। অথচ মিয়ানমার তাদের সমুদ্রসীমা থেকে দ্রুত গ্যাস উত্তোলন শুরু করেছে। পেট্রোবাংলার তথ্যমতে, একসময় দৈনিক ২২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলিত হলেও বর্তমানে তা কমে ১৬৩ কোটি ঘনফুটে নেমেছে। ২০০৯ সাল থেকে আবাসিক ও শিল্প খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ রাখা হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ২০১৭ সাল থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হলেও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দৈনিক ২৬০ কোটি ঘনফুট উৎপাদন থেকে বর্তমানে তা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে।

গ্যাস সঙ্কটের সাথে বিদ্যুৎ খাতের নীতির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ আইন ও নীতির মাধ্যমে দ্রুত বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে প্রভাবশালীদের স্বার্থ রক্ষার অভিযোগ রয়েছে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির উৎস নিশ্চিত না করায় আজ বিদ্যুৎ ও শিল্প উভয় খাতই চাপে পড়েছে। বর্তমানে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীলতা, ডলারের বিনিময় হার ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে এটি ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় সঙ্কট প্রকট হয়েছে। শুক্রবার জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ ১৬৫ কোটি ঘনফুটে নেমে এলেও পরে তা ২৪০ কোটি ঘনফুটে ওঠে, যা দেশের ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার তুলনায় অনেক কম। এই ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প কারখানায়, যেখানে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদী সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবেই আজ একটি উৎসে সমস্যা দেখা দিলে পুরো জ্বালানি ব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ছে।

শেয়ার করুন