গ্যাস সংকটে ফার্নেস অয়েলে ঝুঁকছে বিদ্যুৎ খাত, বাড়বে লোকসান

প্রকাশ:

০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (2026) তারিখে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশে চলমান তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় আপৎকালীন ব্যবস্থা হিসেবে ফার্নেস অয়েল বা ভারী জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে অতিরিক্ত ৪,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ইতোমধ্যে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চমূল্যের এই জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে সরকারের আর্থিক লোকসান ও অর্থনৈতিক চাপ আরও প্রকট হবে।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ করা যাচ্ছে সর্বোচ্চ ২,৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন ১,৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাসের স্থায়ী ঘাটতি থাকছে। দেশের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার মজুত দ্রুত কমে আসায় সেখান থেকে উত্তোলন ১,০৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। অন্যদিকে, ভোলা নর্থ ও ইলিশার মতো নতুন খনিতে গ্যাস থাকলেও পাইপলাইন না থাকায় তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যাচ্ছে না। এই গ্যাস সংকটের কারণে গ্যাসভিত্তিক অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে বাধ্য হওয়ায় সরকার লোডশেডিং এড়াতে ফার্নেস অয়েলচালিত কুইক রেন্টাল ও আইপিপি কেন্দ্রগুলো চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।

চলতি সেপ্টেম্বর মাসে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে দৈনিক গড়ে ৪,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর ফলে বেসরকারি আমদানির পাশাপাশি বিপিসির ওপর নতুন করে ২ লাখ ৪,১০০ টনের রেকর্ড চাহিদার চাপ তৈরি হয়েছে। এই বিপুল চাহিদা মেটাতে বিপিসি ইতোমধ্যে ১ লাখ টন তেল আমদানির প্রক্রিয়া পাইপলাইনে রেখেছে এবং স্থানীয় উৎস থেকে ২৫ হাজার টন সংগ্রহের চেষ্টা করছে।

জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিশে চালু করা যায় এবং এর জন্য কয়লা বা এলএনজির মতো জটিল বন্দর কাঠামোর প্রয়োজন হয় না। এছাড়া বেসরকারি কেন্দ্রগুলোকে নিজস্ব এলসির মাধ্যমে শুল্কমুক্ত সুবিধায় তেল আমদানির অনুমতি দেওয়ায় সরকারের ওপর তাৎক্ষণিক ডলারের চাপ কিছুটা কম। তবে খরচের দিক থেকে এটি চরম ব্যয়বহুল। যেখানে দেশীয় গ্যাসে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ ৪ থেকে ৭ টাকা, সেখানে ফার্নেস অয়েলে শুধু জ্বালানি খরচই ২০ টাকার বেশি। পরিচালন ব্যয় ও ক্যাপাসিটি চার্জসহ প্রতি ইউনিটের মোট উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় ২৫ থেকে ২৭ টাকা ৩৬ পয়সা। ফলে গ্রাহক পর্যায়ে কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করায় সরকারকে বিপুল লোকসান গুনতে হচ্ছে, যা আইএমএফের শর্ত পূরণে বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুন মাসে ফার্নেস অয়েলচালিত কেন্দ্র থেকে দৈনিক গড়ে ২,৫০০ থেকে ২,৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতো, যা জুলাইয়ে বেড়ে ২,৮০০ থেকে ৩,২০০ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়। আগস্টে গ্যাস উত্তোলন সর্বনিম্ন স্তরে নামলে ৬৫টি ফার্নেস অয়েল কেন্দ্র থেকে রাতে সর্বোচ্চ ৩,৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। দেশে ব্যবহৃত ফার্নেস অয়েলের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশই বেসরকারি উদ্যোক্তারা সরাসরি আমদানি করেন, যার বার্ষিক পরিমাণ ২২ থেকে ২৩ লাখ টন। গত জুন থেকে আগস্টের মধ্যে বেসরকারি কেন্দ্রগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৬ লাখ টন তেল আমদানি করেছে।

সংকট কাটাতে সরকারের এই উদ্যোগকে সাময়িক সময়ের জন্য যথাযথ মনে করলেও দীর্ঘমেয়াদে আমদানিনির্ভরতা কমানোর তাগিদ দিয়েছেন ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড অ্যানালিস্ট ড. শফিকুল আলম। তিনি বলেন, অক্টোবরের শেষে বিদ্যুতের চাহিদা কমে এলে ধীরে ধীরে এই ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অনশোর ও অফশোরে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে ভোলার গ্যাস দ্রুত জাতীয় গ্রিডে আনা এবং সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার ঘটানো প্রয়োজন। আগামী গ্রীষ্মের আগেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন নিশ্চিত করার পাশাপাশি অন্তত ১,০০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে যুক্ত করার ওপর জোর দেন তিনি।

শেয়ার করুন