আর্তমানবতার সহায়তায় এবং বিভিন্নমুখী দ্বীনি সহযোগিতায় আমরা যে দান-সদকা করি, তা আল্লাহতায়ালার কাছে অত্যন্ত প্রিয় ও পছন্দনীয় একটি ইবাদত। এর দ্বারা বিপদাপদ দূর হয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হয়, পুণ্য ও প্রতিদান লাভ হয় এবং পরকালীন জীবন সুখী ও সমৃদ্ধ হয়। সুরা হাদিদের ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে? তাহলে তিনি দাতার জন্য তা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেবেন এবং তার জন্য রয়েছে মহাপ্রতিদান।’ এছাড়া সুরা আলে ইমরানের ৯২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তোমরা কোনো পুণ্য অর্জন করতে পারবে না, যতক্ষণ না পছন্দনীয় বস্তু আল্লাহর পথে ব্যয় করবে।’ উকবা ইবনে আমির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি মানুষ কেয়ামতের দিন তার সদকার ছায়াতলে থাকবে, যতক্ষণ না মানুষের মধ্যে ফয়সালা করা হবে’ (মুসনাদে আহমদ : ১৭৩৩৩)।
তবে দানের এই অশেষ সওয়াব ও ফজিলত পাওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে। আমাদের দান ও অনুদান যদি হালাল ও বৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ থেকে হয়, তবেই তা আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে; অন্যথায় এর কোনো প্রতিদান মিলবে না। আল্লাহতায়ালা সুরা বাকারার ২৬৭ নম্বর আয়াতে নির্দেশ দিয়েছেন, হালাল উপার্জিত সম্পদের উৎকৃষ্ট অংশ থেকে ব্যয় করতে এবং মন্দ জিনিস দেওয়ার নিয়ত না করতে। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যখন কোনো বান্দা হালাল সম্পদ থেকে কিছু সদকা করে, আর আল্লাহতায়ালা শুধু হালাল বস্তুই গ্রহণ করেন, তখন রহমান তা ডান হাতে গ্রহণ করেন, যদিও তা একটি খেজুর পরিমাণ হয়। অতঃপর দানটি রহমানের হাতে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এমনকি তা পাহাড়ের চেয়েও বড় ও বিরাট হয়ে যায়’ (মুসলিম : ১০১৪)।
অনেকে হালাল সম্পদ ব্যয় করলেও তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য থাকে রিয়া বা লৌকিকতা। লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দান করলে যাবতীয় চেষ্টা-মেহনত বিফলে যায় এবং প্রতিদান পাওয়ার পরিবর্তে জাহান্নামের শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়। সুরা বাকারার ২৬৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহতায়ালা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে দান করে তা বরবাদ না করার সতর্কবার্তা দিয়েছেন। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, কেয়ামতের দিন সর্বপ্রথম তিন শ্রেণির লোকের ফয়সালা করা হবে—শহিদ, আলেম ও দানবীর। এদের প্রত্যেকেই তাদের দুনিয়াবি নেয়ামতের কথা স্বীকার করার পর যখন বলবে যে তারা আল্লাহর পথে লড়াই করেছে, ইলম শিখেছে বা সম্পদ ব্যয় করেছে, তখন আল্লাহ বলবেন তারা মিথ্যা বলছে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বীর, আলেম বা দানবীর হিসেবে খ্যাতি পাওয়া, যা তারা দুনিয়াতেই পেয়ে গেছে। ফলে তাদের উপুড় করে জাহান্নামের গর্তে নিক্ষেপ করা হবে (মুসলিম : ১৯০৫)।
দান করার পর গ্রহীতাকে খোটা দেওয়া বা কষ্ট দেওয়াও দানের প্রতিদান নষ্ট করে দেয়। আল্লাহতায়ালা ঈমানদারদের সদকাগুলোকে খোটা ও কষ্টদানের মাধ্যমে বরবাদ না করার নির্দেশ দিয়েছেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তিন ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি; তাদের মধ্যে অন্যতম হলো খোটা দানকারী (তিরমিজি : ১২১১)।
পরিশেষে, আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান পেতে হলে দান হতে হবে ইখলাস ও আন্তরিকতাপূর্ণ। আমল যত বড়ই হোক, বিশুদ্ধ নিয়ত ছাড়া তার কোনো মূল্য নেই। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সব আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। যে যেমন নিয়ত করবে, সে তেমন ফল পাবে’ (বোখারি : ১)।





