৩০ ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্রিকস সম্মেলনে নয়াদিল্লি ঘোষণা: ভারতের বড় কূটনৈতিক সাফল্য

প্রকাশ:

বিশ্ব কূটনীতির চরম অস্থিরতা ও টানটান উত্তেজনার মধ্যে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পর্দা উঠেছিল ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, পশ্চিমা বিশ্বের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কযুদ্ধের মতো জটিল প্রেক্ষাপটে আয়োজিত এই সম্মেলনে দীর্ঘ দরকষাকষির পর সর্বসম্মতিক্রমে ১৪০ অনুচ্ছেদের ঐতিহাসিক ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ গৃহীত হয়েছে। এটি বিশ্বরাজনীতিতে ভারতের এক বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছে।

সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সাত বছর পর ভারতের মাটিতে পা রাখেন। তার সঙ্গে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিলির পুতিন, দক্ষিণ আফ্রিকার সিরিল রামাফোসা এবং ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা অংশ নেন। বিশেষ করে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বিপরীত মেরুর দেশগুলোকে একই ঘোষণায় একমত করানো ছিল ভারতীয় কূটনৈতিক দলের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যা তারা সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্মেলনের খাস কামরায় বিশ্বব্যবস্থার চরম বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে বলেন, বর্তমানের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব পুরোনো ও অকার্যকর কাঠামো দিয়ে চলতে পারে না। এর প্রেক্ষিতে জোটটি জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের আমূল সংস্কারের দাবি জানায়। নয়াদিল্লি ঘোষণায় জাতিসংঘের শীর্ষ পদগুলোতে একক আধিপত্যের তীব্র বিরোধিতা করা হয়। এছাড়া চীন ও রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদসহ জাতিসংঘের শীর্ষ পরিষদে ভারত ও ব্রাজিলের স্থায়ী সদস্যপদ পাওয়ার প্রতি নিজেদের জোরালো সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

সদস্য দেশগুলো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার বিষয়ে অভিন্ন অবস্থান নিয়ে সব ধরনের সীমান্ত অতিক্রমী সন্ত্রাসবাদ, সন্ত্রাসী অর্থায়ন ও নিরাপদ আস্তানা নির্মূলে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছে। জম্মু-কাশ্মীরের পেহেলগামে সন্ত্রাসী হামলায় ২৬ জন নিহতের ঘটনায় ব্রিকস তীব্র নিন্দা জানিয়েছে, যা ভারতের বড় কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জোটটি পশ্চিমা বিশ্বের একতরফা বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ও পরিবেশ-সংক্রান্ত কার্বন বর্ডার ট্যাক্সের বিরোধিতা করেছে। ডলারের আধিপত্য কমাতে স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্রিকস পেমেন্ট টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা দ্রুত সচল করার দাবি জানানো হয়েছে।

আঞ্চলিক সংঘাতের বিষয়ে ব্রিকস গাজায় ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ বন্ধ ও ১৯৬৭ সালের সীমানা অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানিয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের নাম উল্লেখ না করে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা বজায় রাখা, লেবানন থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার এবং সুদান ও সিরিয়া সংকটের কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে। সম্মেলনটি ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সাইবার নিরাপত্তা এবং সংক্রামক ব্যাধি মোকাবিলায় সমন্বিত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গঠনের অঙ্গীকার করেছে।

বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক, বৈশ্বিক জিডিপির ৪০ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ২৬ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী ১১ সদস্যের এই জোট আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার বিষয়েও অভিন্ন অবস্থান নেয়।

শেয়ার করুন