বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কের ৭০ মৃত্যুফাঁদ: ৫ বছরে ঝরল ২৪০০ প্রাণ

প্রকাশ:

বরিশাল-কুয়াকাটা মহাসড়কে প্রতিদিন হাজারো যানবাহন যাতায়াত করলেও ১৬৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি বর্তমানে এক অদৃশ্য শঙ্কার নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। পদ্মা সেতু চালুর পর দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে গতি এলেও, সেই অনুপাতে সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন ঘটেনি। মাত্র ২৪ ফুট প্রশস্ত এই দুই লেনের সড়কে অন্তত ৭০টি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক রয়েছে, যা স্থানীয়দের কাছে ‘মৃত্যুফাঁদ’ হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বরিশাল বিভাগে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে বড় একটি অংশ ঘটেছে কুয়াকাটা মহাসড়কের এসব বিপজ্জনক বাঁকে। ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান জানান, বরিশাল থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত মহাসড়কের দুর্ঘটনার হার অত্যন্ত বেশি। তিনি বলেন, পদ্মা সেতু পার হওয়ার পর দ্রুতগতির যানবাহনগুলো যখন এই সরু সড়কে প্রবেশ করে, তখনই বাঁকগুলোতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। এছাড়া বাস কোম্পানিগুলোর সময়ের প্রতিযোগিতা ও ঝুঁকি নিয়ে ওভারটেকিং প্রাণহানি বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি চালকদের দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো বন্ধ এবং সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বোঝাতে গিয়ে স্থানীয়রা সানুহারের বাঁককে অন্যতম আতঙ্ক হিসেবে চিহ্নিত করেন। ২০২২ সালের ২৯ মে ভোরে সানুহার এলাকার তীব্র বাঁকে যমুনা লাইন পরিবহনের একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই ১০ জন নিহত ও ২১ জন আহত হন। মাত্র দুই দিন পর একই স্থানে বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে আরও দুইজন প্রাণ হারান। চলতি বছরের মার্চ মাসেও একই এলাকায় ট্রাক ও থ্রি-হুইলারের সংঘর্ষে আরও একজন নিহত হয়েছেন। সানুহার ছাড়াও বামরাইল, নতুন শিকারপুর, জয়শ্রী, ইচলাদী, ভুরঘাটা, টরকী, আশোকাঠি, মাহিলাড়া, বাটাজোড়, পিঙ্গলাকাঠি, নতুনহাট, রহমতপুর, এয়ারপোর্ট মোড়, ক্যাডেট কলেজ এলাকা, কাশীপুর, গড়িয়ারপাড়, দপদপিয়া, নলছিটি জিরো পয়েন্ট, লক্ষীপাশা, বোয়ালিয়া, চরামদ্দি, শাখারিয়া, মহিষাকাটা, চুনাখালী ও কেঁওড়াবুনিয়াসহ বিভিন্ন স্থানের বাঁকগুলো ব্ল্যাক স্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, বরিশাল বিভাগজুড়ে গত ৫ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪শ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ২০২১ সালে ৫২৪টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৫৮৭ জন, ২০২২ সালে ৪৩০টি দুর্ঘটনায় ৫১১ জন, ২০২৩ সালে ৪৩৬টি দুর্ঘটনায় ৪১১ জন, ২০২৪ সালে ৪৩৯টি দুর্ঘটনায় ৪৫৭ জন এবং সবশেষ ২০২৫ সালের ৪৪৮টি দুর্ঘটনায় ৪২১ জন নিহত হয়েছেন। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, পদ্মা সেতু চালুর আগে এই সড়কে প্রতিদিন ১৬ থেকে ১৯ হাজার যানবাহন চললেও বর্তমানে তা ২৫ থেকে ৩০ হাজারে দাঁড়িয়েছে। ঈদ বা ছুটির মৌসুমে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। বরিশাল জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, সড়কটি সরু হওয়ায় যানবাহনের বাড়তি চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোতে সড়ক প্রশস্তকরণ ও চিহ্ন দেওয়ার কাজ চলছে এবং ৬ লেনের সড়ক নির্মিত হলে প্রাণহানি অনেকাংশে কমে আসবে।

বরিশাল বিআরটিএ-এর পরিচালক জিয়াউর রহমান জানান, দুর্ঘটনারোধে তারা নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচারণা এবং বাস মালিক ও চালকদের সাথে আলোচনা করছেন। দোষী চালকদের লাইসেন্স বাতিলসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে চালকদের অসচেতনতাই অধিকাংশ দুর্ঘটনার মূল কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শেয়ার করুন