চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলামের পড়ার টেবিলে এখন শুধুই অগোছালো বই আর ব্যবহারিক খাতা। একটি বইয়ের নিচে চাপা পড়ে থাকা সেই খাতায় আঁকা রয়েছে প্রায় ২০টি চিত্র। পাশেই পড়ে থাকা স্বর্ণপদক ও বিভিন্ন স্মারক যেন তাঁর সাফল্যের সাক্ষ্য বহন করছে। কিন্তু আরিফুলের বিছানায় রাখা চিপসের প্যাকেটটি আর খাওয়া হলো না তাঁর, টিউশনি থেকে ফেরার পথে কেনা এই প্যাকেটটি এখন তাঁর অনুপস্থিতির এক করুণ স্মারক হয়ে রয়ে গেছে।
মঙ্গলবার রাত ৯টা ৫০ মিনিটের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আবদুর রব হলের মূল ফটকের পাশে একটি ছোট কক্ষের ওপর উঠে ব্যানার লাগানোর সময় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হন ১৯ বছর বয়সী আরিফুল। সহপাঠীরা তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যান। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নগরের এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
আরিফুলের সহপাঠী বিশাল হোসাইন জানান, আরিফুল তাঁদের ব্যাচের সবার প্রিয় ছিলেন। বিভাগের অনুষ্ঠান, আড্ডা কিংবা খেলাধুলা—সবখানেই ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। তিনি বলেন, “আমাদের ব্যাচের নয়নমণি ছিল আরিফুল। গতকালও একসঙ্গে ক্লাস করেছি, আড্ডা দিয়েছি। এভাবে সে চলে যাবে, ভাবতেও পারছি না।” আরিফুল খেলাধুলাতেও সমান দক্ষ ছিলেন। তিনি তাঁদের ব্যাচের ক্রিকেট ও ফুটবল দলের অধিনায়ক ছিলেন। চলতি বছর শহীদ আবদুর রব হলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ৮০০ মিটার দৌড়ে প্রথম ও ৫০০০ মিটার দৌড়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন। এছাড়া আন্তবিশ্ববিদ্যালয় অ্যাথলেটিকস প্রতিযোগিতায় ৮০০ মিটার দৌড়ে দ্বিতীয় এবং একটি জাতীয় অ্যাথলেটিক প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদক জিতেছিলেন তিনি।
আরিফুলের রুমমেট জহিরুল হক, যিনি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী, তাঁর মৃত্যু সংবাদ প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি। জহিরুল বলেন, “আমি আরিফুলকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো দেখতাম। টিউশনি থেকে ফিরে তাঁর আঁকা ব্যবহারিক খাতা আমাকে দেখাতে চেয়েছিল, কিন্তু পরীক্ষা থাকায় সেটি দেখিনি। এখন আরিফুল আমাদের কাছে স্মৃতি হয়ে গেল।”
কৃষক বাবার সংসারে অনটন থাকলেও আরিফুল নিজের খরচ মেটাতে সপ্তাহে পাঁচ দিন শহরে গিয়ে টিউশনি করতেন। মাত্র আড়াই হাজার টাকা আয়ের সেই মানুষটি অনেক সময় সহপাঠীদের সঙ্গে ক্যাফেটেরিয়ায় মাংস দিয়ে খাবার না খেয়ে, মাত্র ১০ টাকার ভাজি দিয়ে সাদা ভাত খেয়ে দিন কাটিয়েছেন, এমনকি খাবারের টাকা শেয়ার করতেও রাজি হতেন না। আরিফুলের চাচাতো ভাই মো. ইলিয়াস জানান, ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনা ও খেলাধুলায় মেধাবী আরিফুল গত শুক্রবারও তাঁর সঙ্গে কথা বলেছিলেন। সেই শেষ কথাটি যে আর কোনোদিন হবে না, তা ছিল পরিবারের কল্পনারও বাইরে। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট আরিফুল ছিলেন অত্যন্ত হাসিখুশি ও মিশুক স্বভাবের মানুষ।
শহীদ ফরহাদ হোসেন হলের ২৩৬ নম্বর কক্ষে থাকতেন।





