বিশ্বকাপে গোলাপি বুটের ছড়াছড়ি: এমবাপ্পে-কেইনদের পছন্দের রহস্য

প্রকাশ:

বিশ্বকাপ ফুটবলের ট্রফি জয়ের সোনালী স্বপ্ন বুকে নিয়ে মাঠের লড়াইয়ে সবুজ ঘাসে যখন বিশ্বসেরা ফুটবলাররা তীব্র গতি আর কৌশলের পসরা সাজিয়ে মরণপণ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠেছেন, ঠিক তখনই চলতি আসরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ কেড়েছে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এক নতুন ফ্যাশন ট্রেন্ড বা শৈল্পিক ধারা। সাধারণ ক্রীড়াপ্রেমী থেকে শুরু করে ফুটবল বোদ্ধা— সবার নজর কেড়ে নিয়েছে মাঠের বুকে খেলে যাওয়া ফুটবলের অভিজাত তারকাদের পায়ের ‘হট পিঙ্ক’ বা চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল গোলাপি রঙের নান্দনিক বুট। চলতি এই টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচেই এখন দেখা যাচ্ছে এক মাঠভর্তি ফুসিয়া রঙের ফুটবল জুতো বা বুটের রাজকীয় ছড়াছড়ি। এই রঙের আভিধানিক ব্যাখ্যা বা পরিচয় দিতে গেলে বলতে হয়— ফুসিয়া বা ‘Fuchsia’ হলো মূলত বেগুনি রঙের এক চমৎকার ও গাঢ় আভা ছড়ানো অত্যন্ত আকর্ষণীয়, দীপ্তিময় ও জ্বলজ্বলে এক বিশেষ ধরণের গাঢ় গোলাপি রঙ। লাতিন আমেরিকার গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের এক বিশেষ গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের রঙিন ও ঝুলন্ত ফুল ‘ফুসিয়া’র প্রস্ফুটিত পাপড়ির তীব্র উজ্জ্বল রঙ থেকেই মূলত এই বিশেষ রঙের নামকরণ করা হয়েছে। এই রঙ সবুজ মাঠের পটভূমিতে ফুটবলারদের পায়ে এক অনন্য দৃশ্যমানতা তৈরি করে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমস এর এক বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমান সময়ের মহাতারকা জুড বেলিংহাম থেকে শুরু করে কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো অনন্য খেলোয়াড়রা এই টুর্নামেন্টে নিজেদের পায়ের বুটের জন্য এই চমৎকার রঙের পক্ষে নীরব রায় দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে তাঁরা ফুটবল খেলার মাঠের সেই বহু বছরের চেনা সনাতনী রূপ এবং পুরুষত্ব সম্পর্কিত গোঁড়া ধ্যান-ধারণা বা সামাজিক সীমানাকে এক বড় ধরণের মনস্তাত্ত্বিক চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করাচ্ছেন।

গোলাপি বুটের এই উন্মাদনা দলগুলোর দিকে তাকালে আরও স্পষ্ট হয়। গোল করার পর তরুণ তুর্কি জুড বেলিংহাম যখন হাঁটু গেঁড়ে স্লাইড করে গোল উদযাপন করেন, তখন তাঁর দিকে উল্লাসে ছুটে আসা ইংল্যান্ড দলের আরও তিন সতীর্থের পায়েও দেখা যায় একই রঙের বুট। এবারের আসরে ইংল্যান্ড স্কোয়াডের মোট ২৬ জন ফুটবলারের মধ্যে ২২ জন খেলোয়াড়ই এই একই রঙের নজরকাড়া বুট পরে মাঠ মাতাচ্ছেন। থ্রি লায়ন্সদের কাপ্তান হ্যারী কেইনও এর ব্যতিক্রম নন; তাঁর পায়ে শোভা পাচ্ছে বিখ্যাত স্পোর্টস ব্র্যান্ড স্কেচার্সের তৈরি করা একদম হাইলাইটার টোনের তীব্র নিয়ন ঘরানার ‘এসকেএক্সটুএস’ মডেলের গোলাপি বুট। কেইন ছাড়াও ইংলিশ তারকা জুড বেলিংহাম এবং গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডের পায়েও একই রঙের জুতো দেখা যায়।

অন্যদিকে, বর্তমান বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার ও গোলদাতাদের তালিকায় শীর্ষে থাকা ফ্রান্সের গতিদানব কিলিয়ান এমবাপ্পে মাঠের ঝড় তুলছেন নাইকি ব্র্যান্ডের তৈরি করা দারুণ আকর্ষণীয় গোলাপি এবং সাদা রঙের মিশ্রণে প্রস্তুত ‘নাইকি মারকিউরিয়াল সুপারফ্লাই’ বুট পরে। সাম্বার দেশ ব্রাজিলের প্রধান প্রাণভোমরা ও বিশ্বসেরা উইঙ্গার ভিনিসিয়াস জুনিয়র ফুটবল পায়ে ড্রিবলিং করছেন ঠিক এমবাপ্পের বুটেরই সমগোত্রীয় ও একই কালার টোনের বোতল-গোলাপি রঙের ‘নাইকি মারকিউরিয়াল ইলেভেন’ জুতো পরে। আবার এই সময়ের ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সেরা গোলমেশিন এবং নরওয়ের গোলক্ষুধা জাগানো স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ চূর্ণ করছেন দুই ধরণের রঙের মিশ্রণে তৈরি ‘নাইকি ফ্যান্টম সিক্স’ মডেলের গোলাপি জুতো পায়ে গলিয়ে। ফুটবল বিশ্ব বা ক্রীড়াঙ্গনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই এই গোলাপি বুট যেন চলতি বিশ্বকাপের অনানুষ্ঠানিক ও অলিখিত প্রধান ফ্যাশন ক্রেজ বা আধুনিক তরুণদের স্টাইল আইকন হিসেবে ফুটবলারদের মাঝে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেছে।

কিন্তু মাঠজুড়ে গোলাপি রঙের ফুটবল বুটের হঠাৎ এত বিপুল জনপ্রিয়তার পেছনের রহস্যটা কী? এর একটি বড় কারণ বাস্তবসম্মত, বৈজ্ঞানিক ও তাত্ত্বিক। বিখ্যাত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বিসিই কনসাল্টিং-এর সিনিয়র উপদেষ্টা ম্যাট পাওয়েল এই ট্রেন্ডের পেছনের আসল রহস্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “বিশ্বখ্যাত ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারী ব্র্যান্ডগুলো এই অত্যন্ত উজ্জ্বল ও জ্বলজ্বলে গোলাপি বা ফুসিয়া রঙটিকে জুতোর জন্য বেছে নিয়েছে কারণ ফুটবল মাঠের যে চিরচেনা স্বাভাবিক গাঢ় সবুজ ঘাস থাকে, তার ঠিক বিপরীতে এই রঙটি সবচেয়ে তীব্র বৈপরীত্য বা কনট্রাস্ট তৈরি করতে সক্ষম।”

আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগে বিশ্বজুড়ে খেলা দেখার ধরনেও এক বিশাল বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে। এখন কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী খেলা দেখেন নিজের হাতের তালুর মধ্যে থাকা ছোট স্মার্টফোনের পর্দায়। এই ছোট স্ক্রিনে খেলা দেখার সময়েও খেলোয়াড়দের পায়ের নিখুঁত কারুকাজ ও পায়ের অবস্থান যাতে দর্শক খুব সহজে বুঝতে পারেন, সেজন্য এই গোলাপি বুটগুলো ‘ব্রডকাস্ট ভিজিবিলিটি’ বা দূরদর্শন সম্প্রচারের ক্ষেত্রে চমৎকার দৃশ্যমানতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। অর্থাৎ মাঠের উজ্জ্বল সবুজ রঙের প্রেক্ষাপটে এই তীব্র ফুসিয়া রঙটি দর্শকের চোখকে অনায়াসেই টেনে নেয়।

ফুটবল খেলায় এই গোলাপি রঙ নিয়ে চিন্তাভাবনা করা বা মাঠের পোশাকে এই রঙের অন্তর্ভুক্তি কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের পাতায় একদম সম্পূর্ণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। তবে আগে এটি সীমাবদ্ধ ছিল কেবল শরীরের উপরিভাগের জার্সি বা শার্টের কাপড়ে। ইতালির ঐতিহ্যবাহী ফুটবল ক্লাব জুভেন্টাস ১৮৯৭ সাল থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ চার বছর নিজেদের মূল জার্সি হিসেবে গোলাপি রঙ ব্যবহার করে ম্যাচ খেলেছে। তেমনিভাবে ইংলিশ ফুটবলের অন্যতম পুরনো দল এভারটন ক্লাবও ১৮৮২ থেকে ১৮৮৪ সাল পর্যন্ত নিজেদের ফুটবলারদের জন্য গোলাপি রঙের কিট নির্ধারণ করেছিল। এমনকি বর্তমান ফুটবল বিশ্বের দিকে তাকালেও আমরা দেখতে পাই, লিওনেল মেসির বর্তমান ক্লাব ইন্টার মায়ামির যে মূল হোম জার্সিটি বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তদের মাঝে সবচেয়ে বেশি বিক্রির তালিকায় রয়েছে, সেটিও হালকা বা বেবি পিঙ্ক রঙের চমৎকার স্ট্রাইপ দিয়ে তৈরি।

তবে জার্সির ক্ষেত্রে গোলাপি রঙের এমন পুরনো ইতিহাস থাকলেও ফুটবলারদের বুট বা জুতোর জগতে গোলাপির এই আগ্রাসী ও রাজকীয় প্রবেশ বেশিদিনের পুরনো নয়। বুটের দুনিয়ায় গোলাপি রঙ সত্যিকারের ঝড় তুলেছিল ২০০৮ সালের দিকে। সেই সময় বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড নাইকি প্রথমবারের মতো বাজারে নিয়ে আসে তাদের বিশেষ সংস্করণ ‘রোসা’ মারকিউরিয়াল ভেপার ফোর। বাজারে আসার সাথে সাথেই এই সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী রঙের বুটটি আপন করে নেন তৎকালীন ফুটবল বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ও নামী সব তারকা খেলোয়াড়েরা। এদের মধ্যে আর্সেনালের ডেনিশ স্ট্রাইকার নিকলাস বেন্টনার এবং বায়ার্ন মিউনিখের ফরাসি উইঙ্গার ফ্রাঙ্ক রিবেরি গোলাপি রঙের এই বুট পরে প্রথম মাঠ কাঁপাতে শুরু করেন। এমনকি লাতিন আমেরিকার পরাশক্তি প্যারাগুয়ের বিপক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ম্যাচের আগে ফ্রান্স জাতীয় দলের ফুটবলারদের নীল জার্সি পরে তোলা অফিশিয়াল গ্রুপ ছবিতেও কয়েকজন খেলোয়াড়ের পায়ে এই বিশেষ গোলাপি রঙের বুট সবার নজর কেড়েছিল।

এর পরবর্তী সময়ে ফুটবল বুটের দুনিয়ায় যখন একের পর এক বিদ্যুৎ-চমকের মতো উজ্জ্বল বা নিয়ন কালারের সিন্থেটিক শেডগুলোর ব্যবহার স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হতে শুরু করল, তখন থেকেই মূলত এই গোলাপি বুটের জনপ্রিয়তা আরও মারাত্মক গতিতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৪ সালের ফুটবল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে জার্মানির হয়ে বিশ্বজয়ের সেই ঐতিহাসিক ও একমাত্র জয়সূচক গোলটি করার সময় মারিও গোতজের পায়ে দেখা গিয়েছিল নিয়ন-লেবু রঙের ‘নাইকি ম্যাজিস্তা ওব্রা ওয়ান’ বুট। কিংবা লিওনেল মেসির পায়ে প্রায়শই দেখা যাওয়া বিখ্যাত ব্র্যান্ড অ্যাডিডাসের তৈরি ‘অ্যাডিডাস এক্স স্পিডপোর্টাল’ বুটের কথা ধরা যাক। এই ধরণের আধুনিক ও উজ্জ্বল কৃত্রিম রঙের বুটগুলো ফুটবল সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠার সমান্তরালে নিয়ন-গোলাপি রঙের বুটের জনপ্রিয়তাও ফুটবলারদের মাঝে এক অনন্য গতি পায়।

এই অগ্রযাত্রার ধারাবাহিকতায় ২০১৯/২০ সালের ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ফুটবলের পুরো মৌসুম জুড়ে দেখা গিয়েছিল এক অদ্ভুত ও দারুণ দৃশ্য। সেই মৌসুমে দেখা যায়, যেসকল ফুটবলাররা মাঠে ফুসিয়া বা গাঢ় গোলাপি রঙের বুট পরে খেলতে নেমেছিলেন, তাঁরা অন্য সাধারণ রঙের বুট পরিহিত খেলোয়াড়দের তুলনায় অনেক বেশিসংখ্যক গোল করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেই সোনালী সময়ে এই বিশেষ রঙের বুট জোড়া পায়ে গলিয়ে মাঠ কাঁপিয়েছিলেন প্রিমিয়ার লিগের সেই আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জেতা লিস্টার সিটির ইংলিশ স্ট্রাইকার জেমি ভার্ডি এবং লিভারপুলের বিশ্বখ্যাত মিশরীয় কিংবদন্তি ফরোয়ার্ড মোহাম্মদ সালাহ।

২০২৪ সালের দিকে এসে, যখন বিশ্বের বড় বড় স্পোর্টস ব্র্যান্ডগুলো আগাম ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের ডিজাইন ও বাজারজাতকরণ নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা শুরু করেছিল, ঠিক সেই সময়ে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ফ্যাশন ও ট্রেন্ড পূর্বাভাস প্রদানকারী সংস্থা ‘ডব্লিউজিএসএন’ (WGSN) আনুষ্ঠানিকভাবে এক ঘোষণায় জানিয়েছিল যে— বেগুনি এবং গোলাপি রঙের একদম মাঝামাঝি থাকা এক তীব্র ও কৃত্রিম উজ্জ্বল রূপের ‘ইলেকট্রিক ফুসিয়া’ রঙটিই হতে যাচ্ছে ২০২৬ সালের গোটা গ্রীষ্মকালীন মৌসুমের সবচেয়ে প্রধান ও প্রভাবশালী ফ্যাশন রঙের ট্রেন্ড। এই ফ্যাশন পূর্বাভাসের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, তবে কি ফুটবল বুট প্রস্তুতকারী বিশ্বের সমস্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ডিজাইন স্টুডিও বা ব্র্যান্ডগুলো একই সংস্থার তৈরি করা এই গোপন প্রতিবেদন বা রিপোর্টটি আগে থেকেই পড়ছিল? এই কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়ে ম্যাট পাওয়েল বলেন, “আসলে বাণিজ্যিক দুনিয়ায় অনেক ব্র্যান্ডই একই সময়ে একদম একই ধরণের ব্যবসায়িক ও মনস্তাত্ত্বিক হিসাব-নিকাশ কষেছিল। আর তার ফলেই আজ বাজারে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, মাঠের দিকে তাকিয়ে দূর থেকে খুব সহজে বোঝার উপায় নেই যে কোন খেলোয়াড়টি আসলে ঠিক কোন ব্র্যান্ডের তৈরি গোলাপি জুতো পরে খেলছেন।”

তবে ফুটবলারদের পায়ে এই গোলাপি জুতো বা বুট শোভা পাওয়ার পেছনে কেবলই যে মাঠে সুন্দর দেখানোর এক চিলতে শৌখিন বা নান্দনিক ফ্যাশন ভাবনা জড়িয়ে আছে, বিষয়টি কিন্তু মোটেও তেমন সরল নয়। এর পেছনে লুকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক কর্পোরেট বাণিজ্যের এক বিশাল ও বিপুল অর্থ উপার্জনের অবিশ্বাস্য দুনিয়া। বর্তমান আধুনিক ফুটবলের পেশাদার যুগে শীর্ষস্থানীয় খেলোয়াড়েরা মূলত কোটি কোটি টাকার আর্থিক চুক্তির বিনিময়ে বাণিজ্যিক ব্র্যান্ডগুলোর নির্দেশ মেনেই মাঠে সেইসব জুতো পরেন, যা পরার জন্য তাঁদেরকে মোটা অঙ্কের অর্থ বা স্পন্সরশিপের টাকা প্রদান করা হয়ে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বর্তমান ফুটবলের অন্যতম বিজ্ঞাপন কিলিয়ান এমবাপ্পের কথাই ধরা যাক। বিশ্বখ্যাত মার্কিন স্পোর্টস ব্র্যান্ড নাইকির সাথে এমবাপ্পের যে দীর্ঘ ১০ বছর মেয়াদি বিশাল স্পন্সরশিপ চুক্তি রয়েছে, তার অংশ হিসেবে কেবল এই নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের তৈরি করা বুটের মডেলিং ও প্রচার করার জন্যই তিনি ব্র্যান্ডটির কাছ থেকে প্রায় ১৪০ মিলিয়ন পাউন্ড বা তার সমপরিমাণ বিপুল পরিমাণ অর্থ আয় করবেন।

বহুজাতিক এই স্পোর্টস ব্র্যান্ডগুলো মূলত এই বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে এক বিশেষ বাণিজ্যিক আশায়। তারা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে এই আশা রাখে যে, বিশ্বমঞ্চের বড় বড় টুর্নামেন্টে যখন সাধারণ ফুটবল ভক্তরা নিজেদের প্রিয় ও আদর্শ তারকা খেলোয়াড়দের পায়ে এই ধরণের নজরকাড়া রঙের আকর্ষণীয় বুট বা জুতো পরা অবস্থায় দেখতে পাবেন, তখন তাঁরা নিজেরাও উদ্বুদ্ধ হয়ে সেই একই মডেলের বুট বাজার থেকে চড়া মূল্যে নিজেদের জন্য কিনে নেবেন। আর কর্পোরেট ব্র্যান্ডগুলোর এই বাণিজ্যিক মনস্তাত্ত্বিক কৌশল যে কতটা সফল, তার প্রমাণ মেলে বর্তমান বাজারের বিক্রির পরিসংখ্যান দেখলেই। বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড নাইকির বর্তমান সময়ের বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রীত ফুটবল বুটগুলোর অন্যতম একটি হলো গোলাপি এবং সাদা রঙের মিশ্রণে তৈরি ‘নাইকি মারকিউরিয়াল সুপারফ্লাই ইলেভেন এলিট’। উল্লেখ্য, এই বুটটি গত ঘরোয়া ফুটবল মৌসুমে কিলিয়ান এমবাপ্পে নিজে পায়ে পরে মাঠ মাতিয়েছিলেন। এমনকি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও জনপ্রিয় জুতো কেনাবেচা ও পুনর্বিক্রয়ের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘স্টকএক্স’ (StockX) তাদের সাম্প্রতিক ব্যবসায়িক প্রতিবেদনে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, বিশ্বজুড়ে তরুণদের মাঝে ফুটবল বুটের যতগুলো জনপ্রিয় ডিজাইন বা সিলুয়েট রয়েছে, তার মধ্যে এই বিশেষ গোলাপি কালারওয়ে বা গোলাপি রঙের জুতোটিই বর্তমানে বিক্রির তালিকার একদম শীর্ষস্থান দখল করে রেখেছে।

বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন শিক্ষালয় লন্ডন কলেজ অব ফ্যাশনের ফ্যাশন সাইকোলজি বা ফ্যাশন মনস্তত্ত্ব বিষয়ের বিশিষ্ট অধ্যাপক ইয়ং-জিন হুর এই বিষয়ে আরও একটি ভিন্ন ও গভীর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, “উজ্জ্বল গোলাপি এবং ফুসিয়া রঙ দুটি সবুজ ফুটবল মাঠের খেলার উপরিভাগের সাথে অত্যন্ত তীব্র এক দৃশ্যমান বৈপরীত্য বা কনট্রাস্ট তৈরি করে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মাঠের সবুজ ঘাসের সাথে তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করার জন্য তো বাজারে আরও অনেক উজ্জ্বল রঙ রয়েছে, যেমন নিয়ন হলুদ বা উজ্জ্বল কমলা রঙ। তাহলে এই রঙগুলোকে ছাপিয়ে গোলাপি রঙটিই কেন এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠল?” তাঁর মতে, “মানসিকভাবে গোলাপি রঙটিকে যে জিনিসটি বাকি সব রঙের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা ও অনন্য করে তোলে তা হলো— এই রঙটি ফুটবল খেলার মাঠের সেই বহু বছরের পুরনো ও সনাতনী পুরুষত্বের ভাবগাম্ভীর্য বা তথাকথিত মাস্কুলিনিটির যে ঐতিহ্যগত সামাজিক ধারণা, তার সাথেও এক ধরণের তীব্র মনস্তাত্ত্বিক বৈপরীত্য ও সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ তৈরি করে।”

ফ্যাশন দুনিয়ার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিগত ২০১০-এর দশক থেকেই পুরুষদের বিলাসবহুল আন্তর্জাতিক ফ্যাশন শোর ক্যাটওয়াক বা রানওয়েগুলোতে এই গোলাপি রঙের ব্যবহার ধীরে ধীরে অনেক বেশি দৃশ্যমান হতে শুরু করেছিল। সেই সময়ে বিশ্বখ্যাত ডিজাইনাররা সমাজের তৈরি করে দেওয়া পুরুষ ও নারীর পোশাকের কঠোর বা রুঢ় লিঙ্গভিত্তিক নিয়মগুলোকে সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলার এক অভিনব চেষ্টা শুরু করেছিলেন। এর ফলে গোলাপির একধরণের অত্যন্ত মৃদু ও কোমল শেড— যা পরবর্তী সময়ে বিশ্বজুড়ে ফ্যাশন দুনিয়ায় ‘মিলেনিয়াল পিঙ্ক’ নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিল— তা অত্যন্ত গর্বের সাথে স্থান করে নেয়।

বর্তমান সময়ে ঠিক একই ধরণের এক চমৎকার ও আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা ফ্যাশন বিপ্লব কিন্তু বিশ্বসেরা ফুটবলারদের মাঠের ভেতরের এবং মাঠের বাইরের ব্যক্তিগত জীবনযাত্রার নিজস্ব স্টাইল বা লাইফস্টাইলের মধ্যেও খুব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অধ্যাপক ইয়ং-জিন হুর এই প্রসঙ্গে আরও যোগ করে বলেন, “বিগত কয়েক দশকে আধুনিক সমাজ ব্যবস্থায় একজন পেশাদার ফুটবলারের সামাজিক ভূমিকা ও গুরুত্ব কিন্তু বহুগুণ বিবর্তিত ও পরিবর্তিত হয়ে গেছে। আজকের ফুটবলাররা কেবল মাঠের ভেতরের এমন কোনো সাধারণ ক্রীড়াবিদ নন যিনি শুধুই একটি নির্দিষ্ট ক্লাব বা দেশের ফুটবল দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন। বরং এর পাশাপাশি তাঁরা বর্তমান সমাজে আন্তর্জাতিক ফ্যাশন দুনিয়ার আইকন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ইস্যু বা সমস্যার প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর এবং একই সাথে নিজেদেরকে সমাজে এক একজন স্বতন্ত্র ও স্বাধীন ব্যক্তি বা ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিশ্বের দরবারে মেলে ধরছেন।”

উদাহরণ হিসেবে ফরাসি মহাতারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের কথাই ধরা যাক, যিনি খেলার মাঠের বাইরে ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চরম ডানপন্থী ও উগ্র মতাদর্শীদের প্রকাশ্য জনসমক্ষে কড়া ভাষায় সমালোচনা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করেননি। আবার এই এমবাপ্পেই বিশ্বখ্যাত লাক্সারি ফ্যাশন হাউস দিওরের পুরুষদের পোশাকের প্রথম বিশেষ কালেকশনের মূল ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর বা প্রধান বিজ্ঞাপনী মুখ হিসেবে নিজেকে মেলে ধরেছিলেন। অন্যদিকে নরওয়েজীয় তারকা আর্লিং হালান্ডের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রাচীনকালের সেই দানবীয় ও হিংস্র ভাইকিং যোদ্ধাদের মতো বিশাল ও দীর্ঘকায় শারীরিক গড়ন হওয়া সত্ত্বেও, মাঠের বাইরে নিজের অত্যন্ত সরল, হাসিখুশি ও কিছুটা বোকা ধরণের অদ্ভুত ব্যক্তিক বৈশিষ্ট্যের কারণে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাখ লাখ নেটিজেন বা ভক্তদের চোখের মণি বা ডার্লিংয়ে পরিণত হয়েছেন।

সুতরাং এটি খুব স্পষ্ট যে, আজকের যুগের একজন শীর্ষ ফুটবলার কেবল মাঠের একজন সাধারণ খেলোয়াড়ই নন, বরং তিনি নিজের নামের জোরেই এক একটি আস্ত আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বা বাণিজ্যিক কর্পোরেট সত্ত্বা। তাই নিজের পায়ের জন্য একটি উজ্জ্বল গোলাপি রঙের বুট বেছে নেওয়া— কিংবা অন্তত ব্র্যান্ডগুলোর দেওয়া এই রঙের বুটটি পরে মাঠে নামার প্রস্তাবটিতে সানন্দে সম্মতি দেওয়া— একজন ফুটবলারকে অবচেতনভাবেই বিশ্ববাসীর কাছে এক বিশেষ বার্তা দিতে সাহায্য করে। আর সেই বার্তাটি হলো— এই খেলোয়াড়টি কেবল খেলায় নয়, বরং আধুনিক ফ্যাশন বা পোশাকের রুচিবোধের দিক থেকেও অত্যন্ত সচেতন, আধুনিক এবং ফুটবল খেলার ইতিহাসের সেই বহু বছরের পুরনো গোঁড়া সামাজিক নিয়ম বা ঐতিহ্যবাহী শৃঙ্খল ভেঙে নতুনের কেতন ওড়াতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। বিশ্ববিখ্যাত স্পোর্টস ব্র্যান্ড নাইকির প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট ডিরেক্টর বা পণ্য ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওডিঙ্গা নিমাকো ফুটবলারদের এই গোলাপি মানসিকতাকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। তিনি বলেন, “বর্তমান যুগের আধুনিক অ্যাথলেট বা অ্যাথলেটরা এই বিশেষ উজ্জ্বল রঙটিকে নিজেদের চরম আত্মবিশ্বাস এবং মাঠের হাজারো মানুষের ভিড়ের মাঝে নিজেকে একদম আলাদা ও অনন্যভাবে ফুটিয়ে তোলার এক জাদুকরী মাধ্যম হিসেবে দেখেন। আর ফুটবলারদের মনের এই আত্মবিশ্বাসী ভাবনাটিই আজ বিশ্বজুড়ে ফুটবল ভক্তদের হৃদয়ে এক দারুণ ইতিবাচক আলোড়ন বা চমৎকার সাড়া ফেলছে।”

শেয়ার করুন