পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটা বাতিলের দাবি, শুনানিতে প্রধান বিচারপতি

প্রকাশ:

সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পুরোটা বাতিল হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন রিটকারীদের আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া। তিনি দাবি করেন, এই সংশোধনী সংবিধানের সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং সংবিধান ধ্বংস করেছে। মঙ্গলবার (৭ জুলাই) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের শুনানিতে তিনি এই মন্তব্য করেন।

আদালতে রিটকারীদের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। এই মামলার আপিল আবেদনের ওপর শুনানি শুরু হয় গত ৬ জুলাই। এর আগে, ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে ছয় বিচারপতির একটি আপিল বেঞ্চ মামলাটির শুনানি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিত হবে মর্মে মুলতবির আদেশ দিয়েছিলেন। সেদিনও রিটকারীর পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া শুনানিতে অংশ নেন। ইন্টারভেনর হিসেবে শুনানিতে অংশ নেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির এবং ব্যারিস্টার এস এম শাহরিয়ার কবির। রাষ্ট্রপক্ষে তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান শুনানি করেন।

গত ৮ ডিসেম্বর শুনানিকালে রিটকারী বদিউল আলম মজুমদারের আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের আবেদন জানান। শুনানির এক পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, “পঞ্চদশ সংশোধনীতে যদি পদ্ধতিগত ত্রুটি থাকে, তাহলে তো পুরোটাই বাতিল করা যায়।”

এর আগে, গত ১৭ ডিসেম্বর, ২০২৪ সালে, হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। একই সঙ্গে সংবিধানে গণভোটের বিধান ফিরিয়ে আনেন আদালত। রায়ে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, গণতন্ত্র সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ এবং এটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বিকশিত হয়। দলীয় সরকারের অধীনে বিগত তিনটি সংসদ নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন হয়নি এবং জনগণের মধ্যে সুষ্ঠু নির্বাচনের আত্মবিশ্বাস জন্মায়নি, যার ফলশ্রুতিতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয়েছে।

হাইকোর্ট রায়ে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল এবং এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত তৎকালীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রায় ঘোষণা করেন। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্তি সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করেন। রায়ে আদালত আরও বলেন, এই অনুচ্ছেদ দুটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামো, অর্থাৎ গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে।

পঞ্চদশ সংশোধনী মাধ্যমে সংবিধানে যুক্ত হওয়া ৭ক, ৭খ এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদকেও আদালত সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও বাতিল ঘোষণা করেন। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ৫৪টি ক্ষেত্রে সংযোজন, পরিমার্জন ও প্রতিস্থাপন আনা হয়েছিল। তবে, আদালত পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী আইন বাতিল করেননি। বাকি বিধানগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার আগামী জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। সংসদ আইন অনুসারে জনগণের মতামত নিয়ে বিধানগুলো সংশোধন, পরিমার্জন ও পরিবর্তন করতে পারবে, যার মধ্যে জাতির পিতার স্বীকৃতির বিষয় এবং ২৬ মার্চের ভাষণের বিষয়গুলো রয়েছে।

গণভোটের বিধান প্রসঙ্গে আদালত বলেন, গণভোটের বিধান বিলুপ্ত করা হয়, যা সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অংশ ছিল এবং ১৯৯১ সালে দ্বাদশ সংশোধনীতে যুক্ত হয়েছিল। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের গণভোটের বিধান বিলুপ্তি সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের ৪৭ ধারা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় বাতিল ঘোষণা করা হলো। ফলে দ্বাদশ সংশোধনীর ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহাল করা হলো।

হাইকোর্টের রায়ে ৭ক, ৭খ এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদ বাতিল করা হয়েছে। ৭ক অনুচ্ছেদে সংবিধান বাতিল, স্থগিতকরণ ইত্যাদি অপরাধ এবং ৭খ সংবিধানে মৌলিক বিধানাবলি সংশোধন অযোগ্য করার কথা বলা ছিল। ৪৪ অনুচ্ছেদে মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ বিষয়ে বলা আছে। ৪৪(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীন হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতার হানি না ঘটিয়ে সংসদ আইনের দ্বারা অন্য কোনও আদালতকে তার এখতিয়ারের স্থানীয় সীমার মধ্যে ওই সব বা এর যেকোনও ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষমতা দান করতে পারবে। এই অনুচ্ছেদটি রায়ে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।

গত ৮ জুলাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়। বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি দেবাশীষ রায় চৌধুরীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের স্বাক্ষরের পর ১৩৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ এই রায় প্রকাশিত হয়। এরপর গত ৩ নভেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে আনা কয়েকটি বিষয় অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ‘লিভ টু আপিল’ দায়ের করা হয়। আপিল আবেদনে পঞ্চদশ সংশোধনীর পুরোটা বাতিল চাওয়া হয়। রিটকারী সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের পক্ষে আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া এই আপিল দায়ের করেন। এরই ধারাবাহিকতায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের অনুমতি দেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।

শেয়ার করুন